মৃত্যুর পর মানুষের শেষ ঠিকানা কবর কিংবা চিতা। ধর্মীয় ও সামাজিক রীতি অনুযায়ী, একজন মৃত মানুষকে শেষ বিদায় জানানো হয় যথাযথ সম্মান ও মর্যাদার সঙ্গে। কিন্তু মৃত্যুর পরও কি নিশ্চিত থাকে মানুষের মরদেহের নিরাপত্তা? বিশেষ করে, কোনো নারীর মরদেহ মর্গের হিমঘরে রাখার পর সেখানে কী ঘটে, তা নিয়ে সামনে এসেছে ভয়াবহ কিছু অভিযোগ।
রোববার (১৮ অক্টোবর) ইউটিউব চ্যানেল ‘আলাপ এক্সপ্লেইন্স’-এর এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, মর্গে সংরক্ষিত নারীদের মরদেহের সঙ্গে বিকৃত যৌনাচারের একাধিক অভিযোগ ও তদন্তের তথ্য। প্রতিবেদনটি শুধু অমানবিক অপরাধের চিত্রই তুলে ধরেনি, বরং হাসপাতালের মর্গের নিরাপত্তাব্যবস্থা, নজরদারি এবং বিদ্যমান আইনের কার্যকারিতা নিয়েও গুরুতর প্রশ্ন সামনে এনেছে।
রাজধানীর অন্যতম সরকারি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে ঘটে যাওয়া কয়েকটি ঘটনা এই উদ্বেগকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের বিভিন্ন থানা ও আশুলিয়া এলাকার মরদেহের ময়নাতদন্তের জন্য এখানে আনা হয়। আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন হতে দেরি হলে পরিচয়হীন কিংবা বেওয়ারিশ মরদেহ সংরক্ষণ করা হয় মর্গের হিমঘরে। অভিযোগ, সেই নির্জন পরিবেশের সুযোগ নিয়েই কিছু কর্মচারী জড়িয়ে পড়েছেন ভয়াবহ অপরাধে।
ডিএনএ পরীক্ষায় মিলেছে শুক্রাণুর উপস্থিতি
অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে ঢাকা উত্তর সিটির একটি বাড়ি থেকে উদ্ধার করা এক নারীর মরদেহ মর্গে পাঠানো হয়। ময়নাতদন্তে স্বাভাবিক মৃত্যুর কথা বলা হলেও পরবর্তী ফরেনসিক পরীক্ষা এবং পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ—সিআইডির ডিএনএ প্রোফাইলিংয়ে ওই মরদেহে পুরুষের শুক্রাণুর উপস্থিতি পাওয়া যায় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এর আগে ২০২৫ সালের নভেম্বরেও একই ধরনের আরেকটি ঘটনা সামনে আসে। সে সময় অন্য এক নারীর মরদেহ ময়নাতদন্তের পর সিআইডির পরীক্ষায় একাধিক পুরুষের শুক্রাণুর উপস্থিতি শনাক্ত হয় বলে দাবি করা হয়েছে। তদন্তে মর্গের তৎকালীন ডোম ও কর্মচারীদের সংশ্লিষ্টতার বিষয়টি উঠে আসে।
এ ধরনের ঘটনায় মরদেহের সঙ্গে বিকৃত যৌনাচার বা মৃতকামিতা—চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় নেক্রোফিলিয়া—নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। তবে অপরাধের সঙ্গে কারও সংশ্লিষ্টতা চূড়ান্তভাবে নির্ধারণের ক্ষেত্রে তদন্তের ফলাফল ও আদালতের সিদ্ধান্ত গুরুত্বপূর্ণ।
আগেও ঘটেছে একই ধরনের ঘটনা
সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের মর্গে এ ধরনের অভিযোগ এবারই প্রথম নয়। ২০১৯ সালে মুন্না ভগত নামে এক সহকারী ডোমের বিরুদ্ধে একাধিক মরদেহের সঙ্গে বিকৃত যৌনাচারের প্রমাণ পাওয়ার কথা জানিয়েছিল সিআইডি।
প্রতিবেদনে বলা হয়, মুন্না ছিলেন তৎকালীন মর্গ ইনচার্জ যতনলালের ভাগ্নে। যতনলালের মাধ্যমেই তাঁর নিয়োগ হয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। ওই ঘটনায় যতনলাল গ্রেপ্তার হলেও পরবর্তী সময়ে জামিনে মুক্তি পান।
সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোতে মর্গের প্রধানের সহকারী নূরে আলম শান্ত এবং তৎকালীন মর্গ ইনচার্জ যতনলালসহ একটি সংঘবদ্ধ চক্রের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ সামনে এসেছে। হাসপাতালের সিসিটিভি ফুটেজ নষ্ট হয়ে যাওয়ার বিষয়টিও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে ফুটেজ নষ্ট হওয়ার কারণ ও এর সঙ্গে কারও সংশ্লিষ্টতা তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, সিআইডির বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা ও ডিএনএ বিশ্লেষণের মাধ্যমে ঘটনার বিভিন্ন দিক খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এ ছাড়া, অনিয়মের প্রতিবাদ করায় হাসপাতালের কয়েকজন চিকিৎসককে হুমকি দেওয়া হয়েছিল বলেও অভিযোগ রয়েছে।
ঢাকার বাইরেও মিলেছে একই ধরনের অপরাধের অভিযোগ
মর্গে মরদেহের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ শুধু রাজধানীর একটি হাসপাতালকে ঘিরে সীমাবদ্ধ নয়। প্রতিবেদনে সিআইডির তদন্তের বরাতে বলা হয়েছে, ২০২১ সালে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এবং ২০২৫ সালে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালেও মর্গের কর্মচারীদের বিরুদ্ধে একই ধরনের অপরাধের প্রমাণ পাওয়া গিয়েছিল।
এ ধরনের ধারাবাহিক ঘটনা হাসপাতালের মর্গ ব্যবস্থাপনা, কর্মীদের জবাবদিহি এবং মরদেহ সংরক্ষণের নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। বিশেষ করে, যেসব মরদেহের পরিচয় শনাক্ত করা যায়নি কিংবা যেগুলো দীর্ঘ সময় হিমঘরে রাখতে হয়, সেগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কার্যকর নজরদারি কতটা রয়েছে, তা খতিয়ে দেখা জরুরি।
নেক্রোফিলিয়া কেন ঘটে?
চিকিৎসাবিজ্ঞানে নেক্রোফিলিয়াকে মৃতদেহের প্রতি যৌন আকর্ষণ বা মৃতদেহকে কেন্দ্র করে যৌন আচরণের সঙ্গে সম্পর্কিত একটি অস্বাভাবিক যৌন প্রবণতা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তবে এ ধরনের অপরাধের পেছনে একটিমাত্র কারণ কাজ করে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই। ব্যক্তির মানসিক অবস্থা, আচরণগত বৈশিষ্ট্য ও অপরাধের পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে বিষয়টি বিশ্লেষণ করতে হয়।
মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) ডা. মো. আজিজুল ইসলাম এ বিষয়ে বলেন, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মধ্যে চরম একাকিত্ব, প্রত্যাখ্যাত হওয়ার ভয় এবং হীনম্মন্যতা কাজ করতে পারে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, তাঁরা মনে করতে পারেন, জীবিত মানুষের সঙ্গে সম্পর্কে জড়ালে প্রত্যাখ্যানের মুখে পড়তে হবে। অন্যদিকে মৃত ব্যক্তি প্রতিবাদ করতে পারবেন না এবং তাঁর ওপর সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব—এমন বিকৃত কল্পনা থেকেও কেউ এ ধরনের অপরাধে জড়াতে পারেন।
তবে মানসিক সমস্যার সঙ্গে অপরাধের সম্পর্ক মূল্যায়নের ক্ষেত্রে সতর্কতা প্রয়োজন। কোনো মানসিক বৈশিষ্ট্য বা রোগের উপস্থিতি দিয়ে সব অপরাধের ব্যাখ্যা দেওয়া যায় না, আর মানসিক অসুস্থতা থাকা মানেই কেউ অপরাধপ্রবণ—এমন ধারণাও সঠিক নয়।
আইনের সীমাবদ্ধতা ও শাস্তির প্রশ্ন
মর্গে মরদেহের সঙ্গে যৌন নিপীড়নের অভিযোগ সামনে আসার পর বাংলাদেশের প্রচলিত আইনে এ ধরনের অপরাধের বিচার কীভাবে নিশ্চিত করা হবে, সেই প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে অপরাধ বিশেষজ্ঞদের বরাতে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের আইনে নেক্রোফিলিয়া বা মৃতকামিতাকে কেন্দ্র করে সুনির্দিষ্ট সংজ্ঞা ও স্বতন্ত্র শাস্তির বিধান নেই। ফলে এ ধরনের ঘটনায় অপরাধের প্রকৃতি, প্রমাণ এবং প্রযোজ্য আইনের ভিত্তিতে বিচারপ্রক্রিয়া এগিয়ে নিতে জটিলতা তৈরি হতে পারে।
আইনজীবীদের মতে, মৃতদেহের সঙ্গে যৌন নিপীড়ন বা বিকৃত যৌনাচারকে স্পষ্টভাবে সংজ্ঞায়িত করে উপযুক্ত শাস্তির বিধান যুক্ত করার বিষয়টি বিবেচনা করা প্রয়োজন। পাশাপাশি, বিদ্যমান আইনের আওতায় অপরাধীদের বিচার নিশ্চিত করার জন্য তদন্তের সক্ষমতা ও ফরেনসিক প্রমাণ সংগ্রহের ব্যবস্থাও শক্তিশালী করতে হবে।
মর্গের নিরাপত্তায় প্রয়োজন কঠোর নজরদারি
বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের অপরাধ প্রতিরোধে শুধু আইন সংশোধন যথেষ্ট নয়; হাসপাতালের ব্যবস্থাপনাতেও কার্যকর পরিবর্তন জরুরি। মর্গ ও মরদেহ সংরক্ষণের কক্ষগুলোতে সার্বক্ষণিক সিসিটিভি ক্যামেরা, প্রবেশ ও বের হওয়ার তথ্য সংরক্ষণ, দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মীদের পরিচয় যাচাই এবং নিয়মিত তদারকি নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
একই সঙ্গে সিসিটিভি ফুটেজ নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত নিরাপদে সংরক্ষণ, অনিয়মের অভিযোগ জানানোর কার্যকর ব্যবস্থা এবং অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করতে হবে। কোনো কর্মচারীর বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে প্রমাণ নষ্ট হওয়ার আগেই তা সংরক্ষণ এবং প্রয়োজনীয় আইনগত পদক্ষেপ নেওয়াও জরুরি।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক সংস্থার সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া মর্গের মতো সংবেদনশীল স্থানে জবাবদিহি নিশ্চিত করা কঠিন। পাশাপাশি, অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত এবং অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে অপরাধের পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে হবে।
মৃত্যুর পর একজন মানুষের নিজের মর্যাদা ও নিরাপত্তা রক্ষার কোনো সুযোগ থাকে না। তাই তাঁর মরদেহের সুরক্ষা নিশ্চিত করার দায়িত্ব রাষ্ট্র, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এবং সংশ্লিষ্ট সবার। মর্গের মতো সংরক্ষিত স্থানে যদি মরদেহই নিরাপদ না থাকে, তবে তা শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের ব্যর্থতা নয়; মানবিক মূল্যবোধ ও আইনের শাসনের জন্যও গভীর উদ্বেগের বিষয়।
সূত্র: আলাপ এক্সপ্লেইন্স



