tanaka

নির্বাচনের আগে চাপে ফ্রান্সের মধ্যপন্থিরা, বাড়ছে বাম ও ডানপন্থিদের প্রভাব

ফ্রান্সে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ ও সহিংসতাকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক অস্থিরতা বেড়েছে। শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কার, বৈষম্য দূর করা এবং শিক্ষায় বিনিয়োগ বাড়ানোর দাবিতে আন্দোলন শুরু হলেও তা...
প্রচ্ছদসারাদেশনাগরপুরে ৬ দশক ধরে একই আঙিনায় মসজিদ-মন্দির, সম্প্রীতির অনন্য দৃষ্টান্ত

নাগরপুরে ৬ দশক ধরে একই আঙিনায় মসজিদ-মন্দির, সম্প্রীতির অনন্য দৃষ্টান্ত

এক পাশে আজান, অন্য পাশে পূজার ঘণ্টা-ঢাক; পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সহাবস্থানে দুই সম্প্রদায়

মুসলমানেরা মসজিদে আদায় করেন নামাজ, আর সনাতন ধর্মাবলম্বীরা মন্দিরে করেন পূজা-অর্চনা। উপাসনালয় দুটি আলাদা হলেও অবস্থান একই আঙিনায়। একদিকে ভেসে আসে আজানের ধ্বনি, অন্যদিকে শোনা যায় পূজার ঘণ্টা ও ঢাকের শব্দ। ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান পৃথক হলেও পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সহনশীলতা ও ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে আবদ্ধ দুই সম্প্রদায়ের মানুষ। টাঙ্গাইলের নাগরপুর উপজেলার চৌধুরী বাড়ি এলাকায় প্রায় ছয় দশক ধরে এভাবেই চলে আসছে ধর্মীয় সহাবস্থান, যা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক অনন্য দৃষ্টান্ত হয়ে উঠেছে।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, নাগরপুরের চৌধুরী বাড়িতে ১৯৩২ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় উঝা ঠাকুর কেন্দ্রীয় দুর্গা মন্দির। পরে ১৯৬৯ সালে সেখানে প্রতিষ্ঠা করা হয় চৌধুরী বাড়ি ক্লাব। ক্লাব প্রতিষ্ঠার পর থেকে প্রতিবছরই উৎসবমুখর পরিবেশে দুর্গাপূজা উদযাপন করা হয়। এর কয়েক বছর পর, ১৯৭২ সালে, একই আঙিনায় নির্মাণ করা হয় নাগরপুর চৌধুরী বাড়ি কেন্দ্রীয় জামে মসজিদ।

একই স্থানে মসজিদ ও মন্দির থাকলেও এ নিয়ে দুই সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যে কখনো বিরোধ বা আপত্তি দেখা দেয়নি বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা। নিজ নিজ ধর্মীয় রীতিনীতি অনুসরণ করে মিলেমিশে বসবাস করছেন তাঁরা।

স্থানীয়দের ভাষ্য, মসজিদে আজানের সময় হলে মন্দিরে বাদ্যযন্ত্র বাজানো বন্ধ রাখা হয়। এ জন্য কাউকে আলাদাভাবে অনুরোধ করতে হয় না। দুর্গাপূজার সময় ঢাকের আওয়াজ, আলোকসজ্জা ও ভক্তদের উপস্থিতিতে মুখর হয়ে ওঠে মন্দির প্রাঙ্গণ। মুসলিম ও হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ পরস্পরের ধর্মীয় অনুভূতি ও উৎসবের প্রতি সম্মান জানান।

গণেশ চন্দ্র রায় জানান, মসজিদে আজানের পর মুসল্লিরা নামাজ আদায় করতে এলে দেবী দুর্গার পূজার আনুষ্ঠানিকতা সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়। নামাজ শেষ হলে আবার শুরু হয় পূজার আয়োজন। এভাবেই সনাতন ধর্মাবলম্বীরা মুসলমানদের ধর্মীয় কার্যক্রমের প্রতি সম্মান দেখিয়ে উৎসব পালন করেন। অন্যদিকে মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষও তাঁদের ধর্মীয় কার্যক্রমে কোনো ধরনের বাধা সৃষ্টি করেন না।

চৌধুরী বাড়ি কেন্দ্রীয় জামে মসজিদের পেশ ইমাম মাওলানা হুমায়ুন কবির বলেন, হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ মন্দিরকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন ধর্মীয় অনুষ্ঠান পালন করেন। অন্যদিকে স্থানীয় মুসলমানেরা মসজিদকে কেন্দ্র করে নিজেদের ধর্মীয় কার্যক্রম পরিচালনা করেন। এ নিয়ে কখনো কাউকে কিছু বলতে হয়নি। সবাই মিলেমিশে নিজ নিজ ধর্মীয় উৎসব পালন করেন।

পূজা উদযাপন কমিটির সাধারণ সম্পাদক ঝুনট কুমার সাহা জানান, হিন্দু সম্প্রদায়ের ধর্মীয় উৎসব যাতে নির্বিঘ্নে অনুষ্ঠিত হতে পারে, সেদিকে স্থানীয় মুসলমানেরা খেয়াল রাখেন। পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সম্প্রীতির এই দৃষ্টান্ত সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ুক—এমনটাই প্রত্যাশা তাঁর।

নাগরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা লিখন বণিক বলেন, বাংলাদেশ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দেশ। চৌধুরী বাড়ি সেই সম্প্রীতির উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। একই আঙিনায় মসজিদ ও মন্দির রয়েছে। মুসলমানেরা সেখানে নামাজ আদায় করেন, আর সনাতন ধর্মাবলম্বীরা পূজা উদযাপন করেন। বিগত বছরগুলোর মতো এ বছরও সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণভাবে দুর্গাপূজা উদযাপিত হচ্ছে।

পুলিশ সুপার মুহাম্মদ শামসুল আলম সরকার জানান, সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব দুর্গাপূজা উপলক্ষে জেলায় ১ হাজার ৩৫৭টি পূজামণ্ডপে নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। পূজা নির্বিঘ্নে সম্পন্ন করতে বিশেষ নিরাপত্তার পাশাপাশি গোয়েন্দা তৎপরতাও বাড়ানো হয়েছে।

স্থানীয় সংসদ সদস্য মো. রবিউল আওয়াল লাভলু বলেন, ‘এ দেশে সংখ্যালঘু বলতে কিছু নেই, আমরা সবাই এ দেশের মানুষ। যার যার ধর্ম, সে সে পালন করবে। একই আঙিনায় পূজামণ্ডপে পূজা উদযাপন ও নামাজ আদায় করা হয়, এতে সমস্যা হয় না। আমরা সবাই মিলেমিশে, সম্প্রীতি ও ঐক্যবদ্ধভাবে বসবাস করছি।’

নাগরপুরের চৌধুরী বাড়ির এই সহাবস্থান প্রমাণ করে, ধর্মীয় বিশ্বাস ও উপাসনার ধরন আলাদা হলেও পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সহনশীলতা ও সহযোগিতার মাধ্যমে সম্প্রীতির পরিবেশ গড়ে তোলা সম্ভব। প্রায় ছয় দশক ধরে একই আঙিনায় মসজিদ ও মন্দিরের অবস্থান স্থানীয় মানুষের কাছে সেই সম্প্রীতিরই প্রতীক হয়ে আছে।