tanaka
প্রচ্ছদজাতীয়ঢাকঢোল আর আলোকসজ্জায় বর্ণিল দুর্গোৎসব আজ শুরু

ঢাকঢোল আর আলোকসজ্জায় বর্ণিল দুর্গোৎসব আজ শুরু

অপেক্ষার প্রহর শেষে শুরু হয়েছে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গোৎসব। শাস্ত্রমতে, অশুভ শক্তির বিনাশ ও শুভ শক্তির প্রতিষ্ঠায় বছর ঘুরে আবারও ধরাধামে আবির্ভূত হয়েছেন দুর্গতিনাশিনী দশভূজা দেবী দুর্গা। পঞ্চমীর বোধনের পর আজ মহাষষ্ঠী। ঢাক, কাঁসর, ঘণ্টা, শঙ্খ ও উলুধ্বনির মধ্য দিয়ে বেলতলায় পূজার আনুষ্ঠানিকতা শুরুর পাশাপাশি অনুষ্ঠিত হবে কল্পারম্ভ ও ষষ্ঠীবিহিত পূজা। অধিবাসের মধ্য দিয়ে দেবীকে জানানো হবে আমন্ত্রণ।

দেবী উমার আগমনকে কেন্দ্র করে রাজধানীর মন্দির ও পূজামণ্ডপগুলোতে চলছে শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি। প্রতিমা সাজানো, আলোকসজ্জা, মণ্ডপের সৌন্দর্যবর্ধন এবং দর্শনার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যস্ত সময় পার করছেন আয়োজক ও স্বেচ্ছাসেবকেরা। পূজার আনন্দ ভাগাভাগি করে নিতে প্রস্তুত সনাতন ধর্মাবলম্বী নারী-পুরুষসহ সব বয়সী মানুষ।

সরেজমিনে রাজধানীর ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দির ঘুরে দেখা যায়, প্রতিবছরের মতো এবারও মহামায়া দেবী দুর্গার পাশাপাশি লক্ষ্মী, সরস্বতী, কার্তিক ও গণেশসহ বিভিন্ন দেবদেবীর প্রতিমা নির্মাণ ও সাজসজ্জার কাজ সম্পন্ন হয়েছে। বাহারি রঙের আঁচড়ে মৃন্ময়ী প্রতিমাগুলো পেয়েছে নান্দনিক রূপ। জাতীয় মন্দির হওয়ায় এখানকার প্রতিমা ও পূজার আয়োজন ঘিরে দর্শনার্থীদের আগ্রহও বেশি। পূজা শুরুর আগেই শেষ হয়েছে প্রতিমার রং ও সাজসজ্জার কাজ।

ত্রিশূল, চক্র, ঢাল-তলোয়ারসহ নানা অস্ত্রে সজ্জিত দশভূজা দেবী দুর্গার প্রতিমা। রংবেরঙের আলোকসজ্জা, নান্দনিক নকশা ও জমকালো সাজে সজ্জিত করা হয়েছে মন্দিরের ভেতর ও বাইরের অংশ। দর্শনার্থীদের নির্বিঘ্নে চলাচল এবং পূজার আনুষ্ঠানিকতা সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে মন্দির প্রাঙ্গণে মোতায়েন করা হয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের। পূজা উদ্‌যাপন কমিটির উদ্যোগে খোলা হয়েছে কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণকক্ষ।

বনানী মাঠেও দুর্গোৎসব ঘিরে ব্যাপক প্রস্তুতি দেখা গেছে। গুলশান-বনানী সার্বজনীন পূজা ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে সাজানো হয়েছে প্রতিমা ও পূজাঙ্গন। বাহারি রঙের নকশা এবং দৃষ্টিনন্দন কাঠামোয় বর্ণিল রূপ পেয়েছে পুরো আয়োজন। প্রতিবছরের মতো এবারও বনানী পূজামণ্ডপে পাঁচ দিনজুড়ে থাকছে বিশেষ অনুষ্ঠান। এর মধ্যে রয়েছে সন্ধ্যারতি ও ধুনুচি নাচসহ নানা ধর্মীয় আয়োজন।

রমনা কালীমন্দিরেও দুর্গোৎসবের প্রস্তুতি চোখে পড়ার মতো। মূল সড়ক থেকে মন্দিরের প্রবেশপথে ঢুকতেই সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের ভেতরের রাস্তার দুই পাশে সাদা কাপড়ে তৈরি সারি সারি স্টল দেখা যায়। মন্দিরজুড়ে বাহারি আলোকসজ্জায় আলোকিত হয়ে উঠেছে আশপাশের এলাকাও। দর্শনার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুলিশ ও আনসারসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অতিরিক্ত সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে।

খামারবাড়ি কৃষি ইনস্টিটিউটের পূজামণ্ডপেও চলছে উৎসবের প্রস্তুতি। খামারবাড়ি মোড়ে আলোকসজ্জায় তৈরি করা হয়েছে বিশাল প্রবেশদ্বার। সড়কের দুই পাশে সাজানো হয়েছে লাল-নীল বাতি দিয়ে। নারী ও পুরুষ দর্শনার্থীদের জন্য রাখা হয়েছে বিশেষ ব্যবস্থা।

এ ছাড়া রামকৃষ্ণ মিশন, মিরপুর কেন্দ্রীয় মন্দির, সিদ্ধেশ্বরী মন্দির, শাঁখারীবাজার, পশ্চিম ধানমন্ডির দুর্গামন্দির, আখড়া মন্দির, নিমতলা মন্দির, ফার্মগেট ও বনশ্রীসহ রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় বর্ণাঢ্য আয়োজনে দুর্গাপূজা উদ্‌যাপনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।

দুই দিন মহাসপ্তমী, এরপর অষ্টমী ও নবমীর আনুষ্ঠানিকতা

পঞ্জিকা অনুযায়ী, আগামীকাল মহাসপ্তমী তিথিতে অনুষ্ঠিত হবে দেবী দুর্গার সপ্তমীবিহিত পূজা। চক্ষুদানের মধ্য দিয়ে দেবীর মৃন্ময়ী প্রতিমায় প্রাণ সঞ্চারের প্রতীকী আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হবে। একই সঙ্গে ব্রহ্মাণী, কালিকা, দুর্গা, কার্তিকী, শিব, রক্তদন্তিকা, শোকরহিতা, চামুণ্ডা ও লক্ষ্মীর প্রতীক হিসেবে কলা, কচু, হলুদ, জয়ন্তী, বেল, ডালিম, অশোক, কচু ও ধানসহ নয়টি উদ্ভিদ একত্র করে নবপত্রিকা তৈরি করা হবে। দেবীর নয়টি শক্তির প্রতীক হিসেবে নবপত্রিকাকে পূজা করা হবে।

তিথি বৃদ্ধির কারণে এ বছর মহাসপ্তমীর পূজা দুই দিন ধরে অনুষ্ঠিত হচ্ছে। চন্দ্রের গতির ওপর নির্ভর করে তিথির এই পরিবর্তন ঘটে। সে অনুযায়ী, রোববার অনুষ্ঠিত হবে দেবী দুর্গার শুক্লা মহাসপ্তমীর অধিক পূজা।

সোমবার মহাঅষ্টমী তিথিতে অনুষ্ঠিত হবে মহাঅষ্টমাদি কল্পারম্ভ ও মহাঅষ্টমীবিহিত পূজা। এদিন নতুন পোশাকে সজ্জিত হয়ে সনাতন ধর্মাবলম্বী নারী-পুরুষ, শিশু-কিশোর ও প্রবীণেরা দেবীর চরণে পুষ্পাঞ্জলি দেবেন। একই দিনে অনুষ্ঠিত হবে সন্ধিপূজা ও কুমারীপূজা।

কুমারীপূজায় একটি কুমারী কন্যাকে জীবন্ত প্রতিমা হিসেবে কল্পনা করে জগজ্জননীর উদ্দেশে শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয়। শাস্ত্রীয় বিধান অনুসারে, এদিন পূজিত কুমারী কন্যাকে দেবীর ষষ্ঠ রূপ ‘উমা’ নামে অভিহিত করা হয়। ভক্তদের মতে, কুমারীপূজা ঈশ্বরের উপাসনা, মানববন্দনা ও নারীর মর্যাদা প্রতিষ্ঠার এক অনন্য সম্মিলন। নারীর সম্মান, মানুষের প্রতি শ্রদ্ধা এবং ঈশ্বরের আরাধনাই এ পূজার অন্তর্নিহিত শিক্ষা।

মঙ্গলবার নবমী তিথিতে অনুষ্ঠিত হবে মহানবমীবিহিত পূজা। পূজা শেষে বিভিন্ন মণ্ডপে ভক্তদের মধ্যে বিতরণ করা হবে মহাপ্রসাদ। সবশেষে বুধবার বিজয়া দশমীতে দর্পণ বিসর্জনের মধ্য দিয়ে দেবী দুর্গাকে বিদায় জানানো হবে।

ঘোড়ায় আগমন, নৌকায় গমন

ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দিরের পুরোহিত জানান, শাস্ত্রমতে, সপ্তমীতে দেবীর আগমন এবং দশমীতে গমন হয়। দেবী দুর্গার আগমন ও প্রস্থানের বাহনকে কেন্দ্র করে প্রচলিত ধর্মীয় বিশ্বাস রয়েছে। সেই বিশ্বাস অনুযায়ী, এ বছর দেবীর আগমন ঘোড়ায় এবং প্রস্থান নৌকায়।

পুরোহিতের ভাষ্য অনুযায়ী, ঘোড়ায় দেবীর আগমনকে সমাজ ও রাজনীতিতে কিছুটা অস্থিরতা এবং আকস্মিক প্রাকৃতিক দুর্যোগের পূর্বাভাস হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়। অন্যদিকে, নৌকায় দেবীর গমনকে শুভ লক্ষণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। প্রচলিত বিশ্বাস অনুসারে, এর মধ্য দিয়ে দেশে শস্যের ভালো ফলন, অমঙ্গল দূর হওয়া এবং সুখ-সমৃদ্ধির প্রত্যাশা করা হয়।

সারা দেশে ৩৩ হাজার ৮৫১ মণ্ডপে দুর্গাপূজা

বাংলাদেশ পূজা উদ্‌যাপন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক সন্তোষ শর্মা জানান, এ বছর সারা দেশে মোট ৩৩ হাজার ৮৫১টি মণ্ডপে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এর মধ্যে ঢাকা মহানগরে রয়েছে ২৫৮টি মণ্ডপ।

তিনি বলেন, নির্বিঘ্নে পূজা উদ্‌যাপন নিশ্চিত করতে এবার সারা দেশের পূজামণ্ডপগুলোর জন্য ২২ দফা নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে দফায় দফায় বৈঠক হয়েছে। পূজামণ্ডপগুলোতে নজরদারি জোরদার করার পাশাপাশি প্রতিটি মণ্ডপে স্বেচ্ছাসেবক নিয়োগ করা হয়েছে।

সন্তোষ শর্মা আশা প্রকাশ করেন, ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য ও উৎসবমুখর পরিবেশে এবার শারদীয় দুর্গোৎসব উদ্‌যাপিত হবে। তবে নিরাপত্তা কেবল পূজার পাঁচ দিনের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে বছরের ৩৬৫ দিনই সবার জন্য নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।