যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যৌথ হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি–এর মৃত্যুর পর বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে—কে ধরবেন ইরানের হাল? প্রায় চার দশক ধরে কঠোর নিয়ন্ত্রণে দেশ পরিচালনা করা এই নেতার কোনো আনুষ্ঠানিক উত্তরসূরি ঘোষণা করা হয়নি। ফলে গভীর অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে ইরানের ইসলামি শাসনব্যবস্থা।
ইরানের সংবিধান অনুযায়ী, ৮৮ জন জ্যেষ্ঠ আলেমদের নিয়ে গঠিত ‘অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্টস’ বা বিশেষজ্ঞ পরিষদ নতুন সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচন করবে। ১৯৭৯ সালের বিপ্লবের পর এ ধরনের পরিস্থিতি একবারই তৈরি হয়েছিল। ১৯৮৯ সালে ইসলামি প্রজাতন্ত্রের প্রতিষ্ঠাতা আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনি–এর মৃত্যুর পর একই পরিষদ খামেনিকে সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে নির্বাচিত করেছিল।
তবে বর্তমান প্রেক্ষাপট অনেক বেশি জটিল। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা দিয়েছেন, হামলা অব্যাহত থাকতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে বিশেষজ্ঞ পরিষদের সদস্যরা নিরাপদে একত্রিত হতে পারবেন কি না, তা নিয়েও সংশয় রয়েছে। নতুন নেতাকে অবশ্যই পুরুষ, জ্যেষ্ঠ আলেম, রাজনৈতিকভাবে দক্ষ এবং ইসলামি প্রজাতন্ত্রের নীতির প্রতি অনুগত হতে হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সম্ভাব্য উত্তরসূরি হিসেবে কয়েকজনের নাম আলোচনায় রয়েছে। নিচে তাদের সংক্ষিপ্ত পরিচয় তুলে ধরা হলো।
মোজতবা খামেনি
সর্বোচ্চ নেতার দ্বিতীয় পুত্র মোজতবা খামেনি দীর্ঘদিন ধরে পর্দার আড়াল থেকে প্রভাব বিস্তার করে আসছেন। ইরানের শক্তিশালী সামরিক বাহিনী ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) এবং আধাসামরিক বাহিনী বাসিজ–এর সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। তবে শিয়া ধর্মতাত্ত্বিক কাঠামোয় বংশানুক্রমিক শাসন ভালো চোখে দেখা হয় না। বিশেষ করে যে বিপ্লব রাজতন্ত্র উৎখাত করেছিল, সেখানে পিতার স্থলাভিষিক্ত হিসেবে পুত্রের আবির্ভাব বিতর্কের জন্ম দিতে পারে। তাছাড়া ধর্মীয় পদমর্যাদায় তিনি খুব উচ্চ পর্যায়ে নন। ২০১৯ সালে যুক্তরাষ্ট্র তার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে।
আলিরেজা আরাফি
আলিরেজা আরাফি খামেনির ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত এবং বর্তমানে বিশেষজ্ঞ পরিষদের ডেপুটি চেয়ারম্যান। তিনি প্রভাবশালী গার্ডিয়ান কাউন্সিল–এর সদস্য এবং ইরানের মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্থার প্রধান। দক্ষ প্রশাসক হিসেবে তার সুনাম রয়েছে। প্রযুক্তিবান্ধব এই আলেম আরবি ও ইংরেজিতে সাবলীল। তবে নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে তার সম্পর্ক তুলনামূলকভাবে কম ঘনিষ্ঠ বলে মনে করা হয়।
মোহাম্মদ মেহদি মিরবাঘেরি
মোহাম্মদ মেহদি মিরবাঘেরি বিশেষজ্ঞ পরিষদের একজন কট্টরপন্থী সদস্য এবং রক্ষণশীলদের প্রতিনিধি হিসেবে পরিচিত। সম্প্রতি গাজা প্রসঙ্গে বিতর্কিত মন্তব্য করে তিনি আলোচনায় আসেন। তিনি মনে করেন, পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে সংঘাত এড়ানো কঠিন। বর্তমানে তিনি কোম শহরের ‘ইসলামিক সায়েন্সেস একাডেমি’র প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
হাসান খোমেনি
ইসলামি প্রজাতন্ত্রের প্রতিষ্ঠাতা আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনি–এর নাতি হাসান খোমেনি বিপ্লব-উত্তর প্রজন্মের কাছে বিশেষ গ্রহণযোগ্যতা রাখেন। তবে তিনি শাসনব্যবস্থার কট্টরপন্থীদের তুলনায় কিছুটা উদারপন্থী হিসেবে পরিচিত। ২০১৬ সালে তাকে বিশেষজ্ঞ পরিষদের নির্বাচনে অংশ নিতে বাধা দেওয়া হয়েছিল। নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর তার প্রভাব সীমিত বলেই মনে করা হয়।
হাশেম হোসেইনি বুশেহরি
হাশেম হোসেইনি বুশেহরি বিশেষজ্ঞ পরিষদের প্রথম ডেপুটি চেয়ারম্যান এবং খামেনির ঘনিষ্ঠদের একজন। তবে অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার রাজনীতিতে তার দৃশ্যমান প্রভাব তুলনামূলকভাবে কম। আইআরজিসি’র সঙ্গে তার সম্পর্ক কতটা গভীর, তা নিয়েও স্পষ্ট তথ্য নেই।
ইরানের শাসকগোষ্ঠী দ্রুত একজন উত্তরসূরি নির্বাচনের মাধ্যমে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে চাইবে। কিন্তু চলমান মার্কিন হামলার প্রেক্ষাপটে এই প্রক্রিয়া কতটা নির্বিঘ্ন হবে, তা নিয়ে দেশ-বিদেশে উদ্বেগ বাড়ছে।



