tanaka

দুর্গাপূজায় আরেক উৎসবের নাম কটিয়াদীর ঐতিহ্যবাহী ঢাকের হাট

দুর্গাপূজার আনন্দকে পূর্ণতা দিতে কিশোরগঞ্জের কটিয়াদীতে প্রায় ৫০০ বছরের ঐতিহ্যবাহী ঢাকের হাট বসেছে। দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে আসা বাদকদের পরিবেশনায় মুখর পুরান বাজার। এখানে একক ঢাকি থেকে বড় বাদকদলের পারিশ্রমিক নির্ধারিত হচ্ছে ২০ হাজার থেকে দুই লাখ টাকা পর্যন্ত।
প্রচ্ছদসারাদেশদুর্গাপূজায় আরেক উৎসবের নাম কটিয়াদীর ঐতিহ্যবাহী ঢাকের হাট

দুর্গাপূজায় আরেক উৎসবের নাম কটিয়াদীর ঐতিহ্যবাহী ঢাকের হাট

দুর্গাপূজা মানেই উলুধ্বনি, ধুনুচি নাচ আর ঢাক-ঢোলের বাদ্য। ষষ্ঠী থেকে বিসর্জন—ঢাকের আওয়াজ ছাড়া পূজার আনন্দ যেন অপূর্ণ। আর এই ঢাকির খোঁজেই কিশোরগঞ্জের কটিয়াদীতে প্রায় ৫০০ বছর ধরে বসছে ঐতিহ্যবাহী ‘ঢাকের হাট’।

নাম ঢাকের হাট হলেও এখানে বাদ্যযন্ত্র কেনাবেচা হয় না। এ হাট মূলত ঢাকি ও বাদ্যযন্ত্রশিল্পীদের মিলনমেলা। বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা বাদকরা নিজেদের দক্ষতা তুলে ধরেন বাজনার তালে তালে। তাদের পরিবেশনা শুনে পছন্দের দল নির্বাচন করেন পূজা আয়োজকরা। দরদাম চূড়ান্ত হলে নির্ধারিত পারিশ্রমিকে পূজামণ্ডপে বাজানোর জন্য চুক্তি হয়।

বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) সকালে কটিয়াদী পুরান বাজারে শুরু হয়েছে এ হাট। চলবে ষষ্ঠীর গভীর রাত পর্যন্ত। সকাল থেকেই ঢাকের হাটে জমে উঠেছে বাদকদের আনাগোনা। চারদিকে ঢাক, ঢোল, কাঁসি, ঝনঝনি, করতাল ও মন্দিরার শব্দ। এর সঙ্গে মিশেছে সানাই ও বাঁশির সুর। আধুনিক বাদ্যযন্ত্রের পরিবেশনাও যোগ করেছে ভিন্ন মাত্রা। সব মিলিয়ে পুরান বাজার পরিণত হয়েছে তাল ও সুরের মিলনমেলায়।

দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে বাদ্যযন্ত্র নিয়ে হাজির হয়েছেন বাদকরা। সরেজমিনে দেখা যায়, হাটে মুন্সীগঞ্জের বিক্রমপুরের বাদকদের উপস্থিতি বেশি। এ ছাড়া নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর, নরসিংদীসহ অন্তত ১০টি জেলা থেকে এসেছেন বিভিন্ন দলের সদস্যরা। চলছে নিজেদের সেরা পরিবেশনা তুলে ধরার প্রতিযোগিতা। কার বাজনা বেশি ভালো, কার তালে মুগ্ধ হবেন পূজা আয়োজকরা—সেই চেষ্টায় ব্যস্ত সবাই।

অন্যদিকে, পছন্দের বাদকদল খুঁজছেন পূজা আয়োজকরা। বিভিন্ন দলের বাজনা শুনে, দক্ষতা যাচাই করে এবং পারিশ্রমিক নিয়ে আলোচনা করে চুক্তি করছেন তারা। চুক্তি অনুযায়ী, পূজার দিনগুলোতে মণ্ডপে ঢাক, সানাই, কাঁসি ও করতাল বাজাবেন বাদকরা।

হাটে গফরগাঁওয়ের কাজল চন্দ্র ভৌমিকের সঙ্গে কথা হয়। তিনি এক ঢাকির সঙ্গে ২২ হাজার টাকায় চুক্তি করেছেন। কাজল চন্দ্র বলেন, ‘সবার বাজনা শুনেছি। যেটা মন ছুঁয়েছে, তাকেই নিয়েছি।’

হবিগঞ্জ থেকে জয়চন্দ্র কর্মকার ও আশীষ রবিদাস এসেছেন পূজার জন্য বাদকদল নির্বাচন করতে। তারা বলেন, ‘এই প্রথম ঢাকের হাটে এসেছি। খুব ভালো লাগছে। চেষ্টা করছি সাধ্যের মধ্যে ভালো একটা দল নিতে।’

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, হাটে একক ঢাকি যেমন রয়েছেন, তেমনি রয়েছে দলগত পরিবেশনার ব্যবস্থা। একজন ঢাকির পারিশ্রমিক ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকা। ছোট ও মাঝারি দল ২০ হাজার থেকে ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত চাইছে। বড় দলের ক্ষেত্রে পারিশ্রমিক ৫০ হাজার থেকে দেড় লাখ টাকা, এমনকি দুই লাখ টাকা পর্যন্ত হতে পারে। চুক্তি অনুযায়ী, প্রতিমা বিসর্জন পর্যন্ত মণ্ডপে বাদ্য বাজাবেন তারা। এ সময় বাদকদের থাকা-খাওয়া ও অন্যান্য প্রয়োজনের দায়িত্বও থাকে পূজা আয়োজকদের ওপর।

বিক্রমপুর থেকে আসা সুমন চন্দ্র দাস ও পরিমল দাস দুই দশক ধরে এ হাটে অংশ নিচ্ছেন। তাদের ভাষ্য, আগে তাদের বাবা-দাদারা এখানে আসতেন। এখন তারা সেই ঐতিহ্য ধরে রেখেছেন।

সুমন ও পরিমল বলেন, ‘ফোনে চুক্তি করলেও পারতাম, কিন্তু ঢাকের হাটে না এলে মন মানে না।’ তবে পারিশ্রমিক নিয়ে তাদের আক্ষেপও রয়েছে। তারা বলেন, ‘আমরা এ দিনটির জন্য অপেক্ষা করি। বাজারে সবকিছুর দাম বেশি। খাটাখাটনির তুলনায় পারিশ্রমিক পাওয়া যায় না। তবু পূর্বপুরুষের পেশা ধরে রেখেছি। আগে বাপ-দাদারা আসতেন, এখন আমরা আসি।’

তিন দশক ধরে কটিয়াদীর ঢাকের হাটে আসছেন গাজীপুরের কাপাসিয়ার নন্দদুলাল দাস। তিনি বলেন, ‘ফোনে অনেকে যোগাযোগ করেছে, কিন্তু যাইনি। হাটের টান অন্যরকম। তাই দলবল নিয়ে চলে এসেছি। এখানে না এলে আনন্দটা পাই না। আর বছরে একবার অনেক বাদকের সঙ্গে দেখা হয়।’

নন্দদুলাল জানান, এবার এক পূজা আয়োজক তার দলকে এক লাখ ৩০ হাজার টাকা পারিশ্রমিক দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছেন। সম্ভবত ওই আয়োজকের সঙ্গেই চুক্তি করবেন তিনি।

ঐতিহ্যের আড়ালে অব্যবস্থাপনা

শত বছরের ঐতিহ্য থাকলেও ঢাকের হাটে রয়েছে নানা অব্যবস্থাপনা। বাদকদের জন্য নির্দিষ্ট জায়গা নেই। নেই পর্যাপ্ত খাবার পানির ব্যবস্থা, শৌচাগার কিংবা থাকার উপযুক্ত পরিবেশ। যে যেখানে পারছেন, বাদ্যযন্ত্র নিয়ে বসছেন। বৃষ্টি হলে আশ্রয় নেওয়ারও পর্যাপ্ত জায়গা নেই।

বাদকদলের সদস্য খোকন মণিঋষি বলেন, ‘ঐতিহ্য টিকিয়ে রাখতে চাইলে দায়িত্বশীল হতে হয়। অবহেলায় ঐতিহ্য মরে যায়।’

তার মতে, ঢাকের হাটের ঐতিহ্য ধরে রাখতে হলে বাদকদের জন্য প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা জরুরি।

যেভাবে শুরু হয়েছিল ঢাকের হাট

ঢাকের হাটের তত্ত্বাবধানে রয়েছে স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন শ্রী মা সংঘ। সংগঠনটির সভাপতি শীতল চন্দ্র সাহা জানান, ষোড়শ শতকে সামন্তরাজা নবরঙ্গ রায়ের আমলে এ হাটের সূচনা হয়।

তার বর্ণনা অনুযায়ী, একবার দুর্গাপূজার জন্য সেরা ঢাকি খুঁজতে বিক্রমপুরে বার্তা পাঠান রাজা। সেই আহ্বানে নৌকাযোগে বহু ঢাকি কটিয়াদীতে আসেন। রাজা নিজে তাদের বাদ্য পরিবেশনা শুনে সেরা দলটি নির্বাচন করেন। সেই ঘটনা থেকেই ঢাকের হাটের প্রচলন শুরু হয়, যা সময়ের পরিক্রমায় ঐতিহ্যে পরিণত হয়েছে।

৪১৮ মণ্ডপে দুর্গোৎসব

কিশোরগঞ্জের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মিজানুর রহমান জানান, এবার জেলায় মোট ৪১৮টি মণ্ডপে দুর্গোৎসব অনুষ্ঠিত হচ্ছে। পূজামণ্ডপের নিরাপত্তা ও সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।

ঐতিহ্য, সুর আর উৎসবের আবহে কটিয়াদীর ঢাকের হাট তাই শুধু বাদক নির্বাচন করার জায়গা নয়; এটি বাংলার লোকজ সংস্কৃতি ও দুর্গাপূজার আনন্দের এক অনন্য অনুষঙ্গ। তবে এই ঐতিহ্যকে আগামী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিতে হলে বাদকদের মর্যাদা, ন্যায্য পারিশ্রমিক ও প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করার বিকল্প নেই।