tanaka
প্রচ্ছদআন্তর্জাতিক২৩০০ চাকরিতে আবেদন করেও বেকার প্রিন্সটনের পিএইচডিধারী তরুণ

২৩০০ চাকরিতে আবেদন করেও বেকার প্রিন্সটনের পিএইচডিধারী তরুণ

যুক্তরাষ্ট্রের প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে পিএইচডি করেছেন জ্যাক ওয়েইস। তাঁর গবেষণাকর্ম নোবেল কমিটির আলোচনাতেও স্থান পেয়েছে। এত উচ্চতর ডিগ্রি, গবেষণার অভিজ্ঞতা ও স্বীকৃতি থাকার পরও স্থায়ী চাকরি পাচ্ছেন না ৩০ বছর বয়সী এই তরুণ। ২০২৪ সালে পিএইচডি শেষ করার পর থেকে দুই হাজার ৩০০টির বেশি চাকরিতে আবেদন করেও মেলেনি কাঙ্ক্ষিত কর্মসংস্থান।

যুক্তরাষ্ট্রের ইউটাহ অঙ্গরাজ্যের সল্টলেক সিটির বাসিন্দা ওয়েইস বর্তমানে বাবা-মায়ের সঙ্গে থাকছেন। নিজের বিশেষায়িত ক্ষেত্রের বাইরেও চাকরির চেষ্টা করেছেন তিনি। সফটওয়্যার প্রকৌশলীর পদে আবেদন করার পাশাপাশি হিমায়িত কাঁকড়ার কেক বিক্রি করে এমন একটি প্রতিষ্ঠানেও চাকরির আবেদন করেছিলেন। সম্প্রতি তাঁর এই দীর্ঘ চাকরির সন্ধান নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল।

বরফ গঠন নিয়ে গবেষণা, তবু চাকরির অনিশ্চয়তা

ওয়েইস রাইস বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সর্বোচ্চ কৃতিত্বের সঙ্গে স্নাতক সম্পন্ন করেন। এরপর ২০১৮ সালে প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি কর্মসূচিতে যোগ দেন। তাঁর গবেষণার বিষয় ছিল রাসায়নিক বিজ্ঞানের বিভিন্ন নীতি এবং অণুর পারস্পরিক ক্রিয়া।

বরফ গঠনের প্রক্রিয়া নিয়ে তাঁর গবেষণা ২০২৪ সালে নোবেল কমিটির এক আলোচনায় বৈজ্ঞানিক গবেষণায় মেশিন লার্নিংয়ের প্রয়োগের উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়। তবে গবেষণায় এমন স্বীকৃতি পাওয়ার পরও পেশাগত জীবনে স্থিতিশীলতা আসেনি।

পিএইচডি শেষ করার পর প্রথমে বিভিন্ন ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানে গবেষণার পদ এবং জাতীয় গবেষণাগারের মর্যাদাপূর্ণ ফেলোশিপের জন্য আবেদন করেন ওয়েইস। কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই কোনো উত্তর পাননি। কিছু প্রতিষ্ঠান সরাসরি তাঁর আবেদন প্রত্যাখ্যান করে।

পরে বিভিন্ন শিল্প খাত ও অঞ্চলে চাকরির জন্য চেষ্টা করেন তিনি। সেখানেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে সাক্ষাৎকারের সুযোগ মেলেনি। প্রিন্সটন ও রাইস বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থীদের সঙ্গে যোগাযোগ করেও উল্লেখযোগ্য কোনো ফল পাননি। তাঁদের কেউ কেউ শুধু নিয়মিত চাকরির বিজ্ঞপ্তি পর্যবেক্ষণের পরামর্শ দিয়েছেন।

এআই প্রতিষ্ঠানে কাজ, কিন্তু ছিল না নিশ্চয়তা

২০২৬ সালের জানুয়ারিতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই ব্যবস্থাকে প্রশিক্ষণ দেওয়ার কাজে বিশেষজ্ঞ নিয়োগকারী একটি নতুন প্রতিষ্ঠানে খণ্ডকালীন কাজ পান ওয়েইস। সেখানে ঘণ্টাপ্রতি ৭০ ডলার পারিশ্রমিক দেওয়া হতো। তবে কাজের নির্দিষ্ট সময়সূচি বা ধারাবাহিকতা ছিল না।

কোনো সপ্তাহে ২০ ঘণ্টা কাজের সুযোগ পেলেও অন্য সপ্তাহে তা কমে চার ঘণ্টায় নেমে আসত। পরে কাজের পরিমাণ আরও কমে যায়। কয়েক সপ্তাহ ধরে কোনো কাজ না পাওয়ার পর মার্চের মাঝামাঝি একটি গ্রুপ চ্যাটে তাঁকে জানানো হয়, প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে তাঁর চুক্তি বাতিল করা হয়েছে।

এবার আইন বিষয়ে পড়ার পরিকল্পনা

দীর্ঘদিন চাকরি খোঁজার পর এখন বিকল্প পেশার কথা ভাবছেন ওয়েইস। আইন বিষয়ে পড়াশোনার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির আবেদন করার পরিকল্পনা করছেন তিনি। এ লক্ষ্যে আগামী নভেম্বরে ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার প্রস্তুতিও নিচ্ছেন।

পাশাপাশি উদ্যোক্তা হওয়ার চেষ্টাও করছেন এই তরুণ। অনাকাঙ্ক্ষিত আগ্রাসী আগাছা অপসারণে ব্যবহার করা যাবে—এমন একটি এআই-চালিত ড্রোন তৈরির কাজ করছেন তিনি।

ওয়েইসের বাবা-মা দুজনই চিকিৎসক। ছেলের উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার অভিজ্ঞতা থাকা সত্ত্বেও চাকরি না পাওয়ার বিষয়টি তাঁদের বিস্মিত করেছে। তাঁর মা হলি কারভার্স ছেলের চাকরির আবেদনগুলো পর্যালোচনা করে দেখেছেন, নিয়োগদাতাদের কাছে নেতিবাচক মনে হতে পারে এমন কোনো বিষয় রয়েছে কি না। কিন্তু স্পষ্ট কোনো সমস্যা খুঁজে পাননি।

ছেলের পরিস্থিতি নিয়ে হতাশা প্রকাশ করে হলি বলেন, ‘এটা সত্যিই অপ্রত্যাশিত। এই পরিস্থিতির ব্যাখ্যা কীভাবে করব, তা বুঝতে পারছি না।’

ওয়েইসের বাবা জন ওয়েইস বলেন, ‘আমি জীবনে কখনোই ভাবিনি, এই ছেলেটিকে চাকরি পাওয়ার জন্য এমন সংগ্রাম করতে হবে।’

নিয়োগের গতি কম, চাপে চাকরিপ্রার্থীরা

দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল-এর সাংবাদিক লিন্ডসে এলিস যুক্তরাষ্ট্রের ৫০টি অঙ্গরাজ্যে চাকরিপ্রার্থীদের অভিজ্ঞতা নিয়ে প্রতিবেদন তৈরির সময় ওয়েইসের সাক্ষাৎকার নেন। তাঁর অভিজ্ঞতা বিশেষভাবে নজর কেড়েছে, কারণ এটি যুক্তরাষ্ট্রের এমন এক শ্রমবাজারের চিত্র তুলে ধরে, যেখানে নিয়োগের গতি কমে এসেছে এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ সীমিত হচ্ছে।

বর্তমান শ্রমবাজারকে অনেক ক্ষেত্রে ‘কম নিয়োগ, কম ছাঁটাই’ পরিস্থিতি হিসেবে বর্ণনা করা হচ্ছে। অর্থাৎ, প্রতিষ্ঠানগুলো নতুন কর্মী নিয়োগে আগের তুলনায় কম আগ্রহ দেখাচ্ছে। একই সময়ে কর্মরত ব্যক্তিরাও সহজে চাকরি পরিবর্তন করছেন না। ফলে নতুন চাকরিপ্রার্থীদের জন্য প্রতিযোগিতা বাড়ছে এবং উপযুক্ত পদ খুঁজে পাওয়া কঠিন হয়ে উঠছে।

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, চলতি গ্রীষ্মে যুক্তরাষ্ট্রে অন্তত ২৭ সপ্তাহ ধরে বেকার থাকা মানুষের অনুপাত প্রায় এক দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। তবে করোনাভাইরাস মহামারি এবং এর পরবর্তী সময়কে এই হিসাবের বাইরে রাখা হয়েছে।

জ্যাক ওয়েইসের অভিজ্ঞতা তুলে ধরছে, উচ্চশিক্ষা, গবেষণায় স্বীকৃতি ও বিশেষায়িত দক্ষতা থাকলেই বর্তমান শ্রমবাজারে চাকরি নিশ্চিত হচ্ছে না। নিয়োগের গতি কমে গেলে অত্যন্ত যোগ্য প্রার্থীদেরও দীর্ঘ সময় ধরে কর্মসংস্থানের অপেক্ষায় থাকতে হতে পারে।

সূত্র: এনডিটিভি ও দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল