সৌদি আরবে হুতিদের হামলার পর নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ কাটছে না। এর প্রভাব পড়েছে দেশটির সঙ্গে বাংলাদেশের আকাশপথের যোগাযোগেও। গত সাত দিনে রিয়াদ ও দাম্মামগামী সরাসরি ও ট্রানজিট রুটের ১১৪টি ফ্লাইট বাতিল হয়েছে। এতে ভোগান্তিতে পড়েছেন ১৭ হাজার ৭০১ জন যাত্রী। পরিস্থিতির কারণে রিয়াদগামী সব ফ্লাইট অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত করেছে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স।
ফ্লাইট বাতিলের সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দীর্ঘ হচ্ছে ভুক্তভোগী যাত্রীদের অপেক্ষার পালা। সবচেয়ে বেশি অনিশ্চয়তায় পড়েছেন সৌদি আরবগামী প্রবাসী কর্মীরা। বাংলাদেশের অন্যতম বড় শ্রমবাজার সৌদি আরব। বিমানবন্দর দিয়ে দেশটিতে যাওয়া যাত্রীদের বড় একটি অংশই শ্রমিক। তাঁদের পাশাপাশি রয়েছেন ওমরাহ পালন করতে যাওয়া যাত্রীরাও। ফ্লাইট বন্ধ থাকায় উভয় শ্রেণির যাত্রীর যাতায়াত কঠিন হয়ে পড়েছে।
বিকল্প রুটে সৌদি আরবে যাওয়ার সুযোগ থাকলেও বাড়তি খরচ অনেকের সামর্থ্যের বাইরে। কেউ ভিসার টাকা জোগাড় করতে বিক্রি করেছেন স্ত্রীর গয়না কিংবা পৈতৃক সম্পত্তি, কেউবা ঋণ করেছেন। একের পর এক ফ্লাইট বাতিলে তাঁদের আর্থিক চাপ আরও বেড়েছে। পরিবারের ভবিষ্যতের কথা ভেবে অনিশ্চিত পরিস্থিতিতেও বিদেশের পথে পা বাড়াতে হচ্ছে অনেককে।
ফ্লাইট বাতিলে দিশাহারা আনোয়ার
শনিবার বেলা ১২টা। হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ২ নম্বর টার্মিনালে দাঁড়িয়ে ছিলেন কিশোরগঞ্জের বাসিন্দা আনোয়ার হোসেন। চোখের কোণে জল, মুখে বিষণ্নতার ছাপ। আনমনে এদিক-সেদিক তাকাচ্ছিলেন তিনি। কী হয়েছে জানতে চাইতেই কান্নায় ভেঙে পড়েন। প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার আগেই চোখ বেয়ে গড়িয়ে পড়ে পানি।
আনোয়ার বলেন, ‘গরিব মানুষ। অভাব-অনটনের সংসার। তাই অর্থের জোগান দিতে সোনার গয়না বিক্রি করে ভিসার টাকা জোগাড় করেছি। ভিসা পাওয়ার পর টিকিট কেটেছিলাম। শনিবার আমার ফ্লাইট ছিল। কিন্তু ফ্লাইট বাতিলের খবরে মাথায় আকাশ ভেঙে পড়েছে।’
পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি আনোয়ার। ঘরে স্ত্রী, দুই সন্তান ও মা-বাবা। বাবা-মায়ের ওষুধ কিনতেই অনেক টাকা খরচ হয়। এমন পরিস্থিতিতে কী করবেন, তা ভেবে পাচ্ছেন না তিনি।
ঋণ করে টিকিট, তবু অনিশ্চিত যাত্রা
একই পরিস্থিতিতে পড়েছেন লালমনিরহাটের শাহাদাত হোসেন। গ্রামে মুদির দোকানের ব্যবসা করতেন তিনি। ব্যবসায় লোকসান হওয়ায় ঋণের চাপে পড়েন। পরে স্ত্রীর গয়না ও বাবার কাছ থেকে পাওয়া সম্পত্তি বিক্রি করে সৌদি আরবে যাওয়ার প্রস্তুতি নেন। কিন্তু ফ্লাইট বাতিল হওয়ায় তাঁর সেই পরিকল্পনা বারবার বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
শাহাদাত জানান, গত ১৩ অক্টোবর তাঁর দাম্মামগামী ফ্লাইট ছিল। বিমানবন্দরে হামলার কারণে সেটি বাতিল হয়। পরে এজেন্সির সঙ্গে যোগাযোগ করলে ১৫ অক্টোবর রিয়াদগামী ফ্লাইটের টিকিট দেওয়া হয়। সেটিও বাতিল হয়ে যায়। শেষ পর্যন্ত ২৬ হাজার টাকা দিয়ে ১৭ অক্টোবর সন্ধ্যা ৬টা ১০ মিনিটে মদিনাগামী ফ্লাইটের টিকিট কাটেন তিনি।
শাহাদাত বলেন, ‘জানি না আজ (শনিবার) কী হবে! আমি তো ওই দেশের কিছু চিনি না। এজেন্সি বলেছে, মদিনায় আমাদের নিতে লোক আসবে। কিন্তু সেখান থেকে দাম্মাম যেতে হলেও নাকি নিজেদের খরচ দিতে হবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘স্ত্রীর গয়না আর বাবার জমি বিক্রি করে এজেন্সিকে টাকা দিয়েছি। কিছু টাকা ধারও করতে হয়েছে। দুবার ফ্লাইট বাতিল হওয়ায় ঢাকায় কয়েক দিন থেকে অনেক টাকা খরচ হয়েছে। তৃতীয়বার নিজের টাকায় টিকিট কাটতে হয়েছে। সেই টাকাও ধার করা। এখন সামান্য কিছু টাকা নিয়ে বিদেশে যাচ্ছি। সেখানে গিয়ে আবার খরচ দিতে হবে। এত টাকা কোথায় পাব? বেতন পাওয়া পর্যন্ত খাওয়ার টাকাই বা কোথায় পাব? এখন আল্লাহ ছাড়া আর দেখার মতো কেউ নেই।’
পরিবারের বাধা, তবু জীবিকার তাগিদ
সৌদি আরবে যাওয়ার জন্য একের পর এক বাধা পেরোতে হচ্ছে সাইফুল হককেও। তাঁর ১৪ অক্টোবর রিয়াদগামী ফ্লাইট ছিল। সেটি বাতিল হওয়ার পরদিন দাম্মামের টিকিট কাটেন। কিন্তু সেই ফ্লাইটও বাতিল হয়। শেষ পর্যন্ত বাধ্য হয়ে মদিনাগামী ফ্লাইটে যাত্রার সিদ্ধান্ত নেন তিনি।
সাইফুল হক বলেন, ‘আমরা সবকিছুই মেনে নিতে বাধ্য হই। আমাদের কিছু করারও থাকে না। এ অবস্থায় যেতে মন চায় না। মা-বাবা, ছেলেমেয়ে, ভাইবোনও যেতে দিতে চায় না। কিন্তু কী করার? জীবিকা অর্জনের জন্য তো যেতেই হবে। তাঁদের একটু ধৈর্য ধরতে বলেছি। এ ছাড়া আর কিছুই করার নেই। প্রবাসে গিয়ে যেন পরিবারের মুখে হাসি ফেরাতে পারি।’
আরমান হোসেনের কণ্ঠেও একই রকম দৃঢ়তা। যুদ্ধের পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ থাকলেও ভিসা হয়ে যাওয়ায় দেশে বসে থাকার কথা ভাবতে পারছেন না তিনি।
আরমান বলেন, ‘যুদ্ধ হলে কী হবে? আমার ভিসা হয়ে গেছে। এই দেশে থেকে কী কাজ করব? দেশে থাকলেও মরতে হয়, যেখানে যাই সেখানেও মরতে হবে। আমরা কি মৃত্যু আটকাতে পারব? এজন্য কোনো ভয় করি না। আল্লাহ সহায়, আল্লাহর নির্দেশেই যাচ্ছি।’
তাঁর মা নিরাপত্তার কথা ভেবে দেশে থেকে যেতে বলছেন। আরমান বলেন, মা বলেছেন, ‘দেশে থাকো, আল্লাহ খাওয়াবে।’ কিন্তু সন্তানদের ভবিষ্যতের কথা ভেবে তাঁকে বিদেশে যেতেই হচ্ছে।
বাড়তি খরচ, দীর্ঘ যাত্রার শঙ্কা
সৌদি আরবে কর্মরত রফিক আহমেদও ছুটি শেষে কর্মস্থলে ফিরতে গিয়ে বিপাকে পড়েছেন। মদিনাগামী ফ্লাইটের টিকিট কাটতে তাঁকে আবারও ২৬ হাজার টাকা খরচ করতে হয়েছে।
রফিক আহমেদ বলেন, ‘পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকলে আমার এই টাকা খরচ হতো না। একটু ভয়ের কারণে নিজে থেকেই যাচ্ছি। কারণ আমার ছুটি শেষ হয়েছে ১২ তারিখ। এখন মদিনা দিয়ে যেতে হবে। একদিকে খরচ বেশি, অন্যদিকে ২০ থেকে ২২ ঘণ্টা অতিরিক্ত ভ্রমণ করতে হবে।’
তিনি জানান, এ বিষয়ে কোম্পানির সঙ্গে কথা বলেছেন। সৌদি আরবে পৌঁছানোর পর পরিস্থিতি বুঝে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নিতে হবে। চাকরি চলে গেলে পথে বসতে হবে বলেও উদ্বেগ প্রকাশ করেন তিনি।
এদিকে, পরিবারের সঙ্গে সময় কাটাতে দেশে এসেছিলেন ফয়সাল আহমেদ। কিন্তু ফ্লাইট বাতিল ও সৌদি আরবের পরিস্থিতি নিয়ে দুশ্চিন্তায় মানসিক চাপে পড়েছেন তিনি।
ফয়সাল আহমেদ বলেন, ‘রিয়াদে আমার অনেক বন্ধুবান্ধব আছে। তাঁদের অনেকের কাজ বন্ধ হয়ে গেছে। বিভিন্ন মানুষের চাকরিও চলে গেছে। বিমানবন্দরের আশপাশের কোম্পানি ও কারখানাগুলো বন্ধ করে দিয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, তাঁর ছুটি ইতিমধ্যে শেষ হয়েছে। কয়েক দিন ধরে সৌদি আরবে ফেরার চেষ্টা করছেন। নির্ধারিত সময়ে যেতে না পারলে কফিলের সঙ্গে কথা বলে ছুটির মেয়াদ বাড়াতে হবে। তবে পাঁচ দিনের মধ্যে সৌদিতে যেতে না পারলে ভিসা বাতিল হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে বলে জানান তিনি। ফলে এখন ভিসা বাঁচানোই তাঁর কাছে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
অনির্দিষ্টকালের জন্য রিয়াদগামী ফ্লাইট স্থগিত
সৌদি আরবে চলমান বিমানবন্দর হামলার পরিপ্রেক্ষিতে যাত্রীদের নিরাপত্তার স্বার্থে রিয়াদগামী সব ফ্লাইট অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত করেছে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স।
বিমান কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, রিয়াদ বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের পরবর্তী নির্দেশনা পাওয়ার পর এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। সিদ্ধান্ত যাত্রীদের জানিয়ে দেওয়া হবে বলেও জানিয়েছে সংস্থাটি।
তবে আগামী ২১ অক্টোবর থেকে দাম্মামগামী ফ্লাইট পুনরায় পরিচালনার পরিকল্পনা করছে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স। এ ক্ষেত্রে দাম্মাম বিমানবন্দরের প্রয়োজনীয় অনুমতি পাওয়া সাপেক্ষে ফ্লাইট পরিচালনা করা হবে।
অন্যদিকে, বিমানের জেদ্দা ও মদিনাগামী ফ্লাইট চালু রয়েছে। ফলে জরুরি প্রয়োজনে এসব বিমানবন্দর ব্যবহার করে সৌদি আরবে যাতায়াত করতে পারবেন যাত্রীরা।
সাত দিনে বাতিল ১১৪ ফ্লাইট, ভোগান্তিতে ১৭,৭০১ যাত্রী
বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) সূত্র জানায়, হুতি বিদ্রোহীদের হামলার মুখে সৌদি আরবের রিয়াদ ও দাম্মাম বিমানবন্দরের কার্যক্রমে বিঘ্ন ঘটায় গত সাত দিনে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে পরিচালিত ১১৪টি ফ্লাইট বাতিল হয়েছে। এসব ফ্লাইটের যাত্রী ছিলেন ১৭ হাজার ৭০১ জন।
বেবিচকের জনসংযোগ বিভাগের সহকারী পরিচালক কাওছার মাহমুদ জানান, বাতিল হওয়া সরাসরি ফ্লাইটগুলোর মধ্যে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের ১৮টি, ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সের ১০টি, সৌদিয়া এয়ারলাইন্সের ১২টি এবং রিয়াদ এয়ারের ১০টি ফ্লাইট রয়েছে।
এ ছাড়া বাতিল হওয়া ট্রানজিট ফ্লাইটের মধ্যে ইন্ডিগো এয়ারের ২২টি, সালামএয়ারের সাতটি, এমিরেটস এয়ারের ১৪টি, কাতার এয়ারওয়েজের নয়টি, ফ্লাইদুবাইয়ের ছয়টি এবং এয়ার ইন্ডিয়ার পাঁচটি ফ্লাইট রয়েছে।
কাওছার মাহমুদ জানান, পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হলে রিয়াদ ও দাম্মাম বিমানবন্দরগামী ফ্লাইট বাতিলের ঘটনা অব্যাহত থাকতে পারে।
ফলে একদিকে সৌদি আরবে কর্মরত প্রবাসীদের কর্মস্থলে ফেরা নিয়ে অনিশ্চয়তা, অন্যদিকে নতুন কর্মসংস্থানের আশায় দেশটিতে যেতে চাওয়া শ্রমিকদের দুর্ভোগ—সব মিলিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ। ঋণ করে বিদেশযাত্রার প্রস্তুতি নেওয়া অনেক কর্মীর জন্য প্রতিটি বাতিল ফ্লাইট মানে নতুন আর্থিক চাপ এবং পরিবারের ভবিষ্যৎ নিয়ে আরও গভীর অনিশ্চয়তা। মানবজমিন থেকে।



