বাংলাদেশের শিপিং ও সামুদ্রিক শিল্পের সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করতে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার, দক্ষ জনশক্তি তৈরি এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন নৌপরিবহন, রেলপথ এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম। তিনি বলেছেন, জাহাজ নির্মাণ ও মেরামত, জাহাজ পুনর্ব্যবহার, বন্দর পরিচালনা, সামুদ্রিক পরিবহন, লজিস্টিকস এবং সমুদ্রের তলদেশে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সামনে বড় সুযোগ রয়েছে।
বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) রাজধানীর কুড়িলে আন্তর্জাতিক কনভেনশন সিটি বসুন্ধরায় (আইসিসিবি) মেরিটাইম ও অফশোর শিল্প নিয়ে আয়োজিত আন্তর্জাতিক প্রদর্শনী ‘৮ম বিমক্স ২০২৬’-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। প্রদর্শনীটির আয়োজন করেছে সেভর ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেড।
শেখ রবিউল আলম বলেন, পরিকল্পিত বিনিয়োগ, প্রযুক্তিগত দক্ষতা বৃদ্ধি এবং প্রশিক্ষিত জনবল গড়ে তোলা সম্ভব হলে সামুদ্রিক খাত দেশের অর্থনীতিতে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখতে পারবে।
তিনি বলেন, নদী, সমুদ্র ও নৌপথের বিস্তৃত নেটওয়ার্ক বাংলাদেশের বড় সম্পদ। প্রায় ১৬ হাজার কিলোমিটার প্রাকৃতিক নৌপথ এবং বঙ্গোপসাগরে দেশের কৌশলগত অবস্থান সামুদ্রিক বাণিজ্য, বন্দর পরিচালনা, শিপিং ও লজিস্টিকস শিল্প সম্প্রসারণের সুযোগ তৈরি করেছে। তবে এসব সুবিধার যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করতে সুপরিকল্পিত উদ্যোগ, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বয় এবং আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতার প্রয়োগ প্রয়োজন।
বন্দর অবকাঠামোর উন্নয়ন প্রসঙ্গে মন্ত্রী জানান, চট্টগ্রাম ও মোংলা সমুদ্রবন্দরের সক্ষমতা বাড়ানো, মাতারবাড়িতে গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ এবং পায়রা সমুদ্রবন্দরকে আরও কার্যকর করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক মানের বন্দর ব্যবস্থাপনা ও আধুনিকায়নের জন্য বৈশ্বিক অভিজ্ঞতা কাজে লাগানো হচ্ছে।
তার মতে, এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে বাণিজ্য সম্প্রসারণ, পণ্য পরিবহনে দক্ষতা বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক সরবরাহ ব্যবস্থায় বাংলাদেশের অবস্থান আরও শক্তিশালী হবে।
শিপিং শিল্পে বিনিয়োগ ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়ানোর মাধ্যমে কর্মসংস্থানের নতুন ক্ষেত্র তৈরি করা সম্ভব বলেও উল্লেখ করেন শেখ রবিউল আলম। বিশেষ করে, বাংলাদেশের দক্ষ নাবিকদের বিদেশের শ্রমবাজারে কাজের সুযোগ সম্প্রসারণের ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
মন্ত্রী বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারের চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নাবিকদের প্রশিক্ষণ, আধুনিক প্রযুক্তিবিষয়ক জ্ঞান এবং পেশাগত দক্ষতা উন্নত করতে হবে। এ ক্ষেত্রে ফিলিপাইনের অভিজ্ঞতা অনুসরণ করে বাংলাদেশের নাবিকদের বৈশ্বিক কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ানো যেতে পারে।
আন্তর্জাতিক সহযোগিতার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে তিনি বলেন, সামুদ্রিক শিল্পে উন্নত দেশ ও প্রতিষ্ঠানের কারিগরি জ্ঞান, প্রযুক্তি এবং ব্যবস্থাপনাগত অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের অগ্রগতিতে সহায়ক হতে পারে। ‘বিমক্স’-এর মতো আন্তর্জাতিক আয়োজন দেশি-বিদেশি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ব্যবসায়িক সম্পর্ক গড়ে তোলা, প্রযুক্তি বিনিময়, বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং যৌথ উদ্যোগ গ্রহণের সুযোগ তৈরি করে।
সামুদ্রিক সম্পদ ব্যবহারের ক্ষেত্রে পরিবেশ রক্ষার বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করার আহ্বান জানান মন্ত্রী। তিনি বলেন, অপরিকল্পিতভাবে সম্পদ আহরণ ও নিয়ন্ত্রণহীন কর্মকাণ্ড সামুদ্রিক প্রতিবেশের ক্ষতি করতে পারে। তাই পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি, দায়িত্বশীল ব্যবস্থাপনা এবং কার্যকর পরিকল্পনার মাধ্যমে সমুদ্রসম্পদের টেকসই ব্যবহার নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
আন্তর্জাতিক শিপিং খাতে পরিবেশবান্ধব জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর উদ্যোগ প্রসঙ্গে শেখ রবিউল আলম বলেন, এ বিষয়ে বিশ্বজুড়ে আলোচনা চলছে। তবে উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে বাংলাদেশের প্রযুক্তিগত প্রস্তুতি, আর্থিক সামর্থ্য ও বাস্তব সীমাবদ্ধতা বিবেচনায় নিয়ে ধাপে ধাপে এগোতে হবে। একই সঙ্গে পরিবেশ সুরক্ষা, সামুদ্রিক নিরাপত্তা এবং মানুষের কল্যাণ নিশ্চিত করাও জরুরি।
তিনি আরও বলেন, সামুদ্রিক শিল্পের উন্নয়নে সরকারি সংস্থা, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, প্রশিক্ষণকেন্দ্র এবং আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে। বিদ্যমান প্রতিবন্ধকতা দূর করে বৈশ্বিক বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতার সক্ষমতা বাড়াতে সরকার উদ্যোগী রয়েছে।
অনুষ্ঠানের আয়োজকদের ধন্যবাদ জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, এ ধরনের আন্তর্জাতিক প্রদর্শনী সামুদ্রিক শিল্পের বিকাশ, প্রযুক্তিগত জ্ঞান বিনিময় এবং বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। এ খাতের উন্নয়নে দেশি-বিদেশি প্রতিষ্ঠান ও বিশেষজ্ঞদের সহযোগিতা অব্যাহত রাখার আহ্বানও জানান তিনি।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন নেদারল্যান্ডসের রাষ্ট্রদূত জোরিস ভ্যান বোমেল, মিয়ানমারের রাষ্ট্রদূত উ কিয়াও সোয়ে মোয়ে, বাংলাদেশ মেরিটাইম ইউনিভার্সিটির উপাচার্য রিয়ার অ্যাডমিরাল মো. নিয়ামাত এলাহী এবং নৌপরিবহন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক কমোডোর মো. শফিউল বারী।



