সরকারের গোপন তথ্য সংবাদমাধ্যমের কাছে প্রকাশকারীদের কঠোর শাস্তি দেওয়ার পক্ষে মত দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এমনকি তথ্য ফাঁসকারীদের গুলি করে হত্যা করা উচিত বলেও মন্তব্য করেছেন তিনি। আগামী ৩ নভেম্বর অনুষ্ঠেয় মধ্যবর্তী নির্বাচন সামনে রেখে বুধবার অ্যারিজোনা অঙ্গরাজ্যের বুলহেড সিটিতে এক নির্বাচনী সমাবেশে বক্তব্য দেওয়ার সময় এ কথা বলেন ট্রাম্প। খবর আল জাজিরার।
সমাবেশে উপস্থিত সমর্থকদের উদ্দেশে ট্রাম্প বলেন, ‘আমার মতে, যারা তথ্য ফাঁস করে তাদের গুলি করা উচিত। আগেকার দিনে তো তথ্য ফাঁসকারীদের গুলিই করা হতো—যেমন ধরুন, কোনো দেশে কখন আক্রমণ চালানো হবে, সেই তথ্য ফাঁস করে দিলে তাদের গুলি করা হতো।’
ট্রাম্পের এ বক্তব্যের পেছনে ২০২৫ সালের জুনে ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযান ‘অপারেশন মিডনাইট হ্যামার’-সংক্রান্ত তথ্য ফাঁসের ঘটনা থাকতে পারে। ইসরাইল ও ইরানের মধ্যে ১২ দিনব্যাপী যুদ্ধ চলাকালে ওই অভিযান পরিচালনা করেছিল যুক্তরাষ্ট্র।
হামলার পর কয়েকটি সংবাদমাধ্যম মার্কিন প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা সংস্থার একটি প্রাথমিক প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশ করে। জনসমক্ষে প্রকাশিত না হওয়া ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, যুক্তরাষ্ট্রের বোমা হামলার লক্ষ্যবস্তু হওয়া কয়েকটি স্থান থেকে ইরান কিছু সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম সরিয়ে নিতে সক্ষম হয়েছিল। প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলোতে হামলার ফলে যে ক্ষয়ক্ষতি হয়েছিল, তা ট্রাম্পের বর্ণনার তুলনায় কম ছিল।
তবে ট্রাম্পের অভিযোগ, শুধু হামলার ফলাফল নয়, সামরিক অভিযানের সময়সূচিও সংবাদমাধ্যমের কাছে ফাঁস হয়েছিল। তার দাবি, এ ধরনের তথ্য প্রকাশের মাধ্যমে সংবাদমাধ্যম মার্কিন সামরিক সদস্যদের ঝুঁকির মধ্যে ফেলেছে। এ প্রসঙ্গে নিউইয়র্ক টাইমস ও সিএনএনের নামও উল্লেখ করেন তিনি।
ট্রাম্প বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের বাহিনী কখন যাত্রা শুরু করেছে এবং কখন গন্তব্যে পৌঁছেছে, সেই তথ্যও প্রকাশ করা হয়েছিল। এর ফলে তাকে বোমা হামলার পরিকল্পনা দুই দিন পিছিয়ে দিতে হয়েছিল বলে দাবি করেন তিনি।
তথ্য ফাঁসের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের শাস্তির বিষয়ে ট্রাম্প বলেন, ‘কেউ একজন তথ্য ফাঁস করেছে। কোনো এক জঘন্য ব্যক্তি—তাদের জেলে পাঠানো উচিত, অথবা গুলি করা উচিত। তাদের বাকি জীবনটা জেলেই কাটানো উচিত।’
সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে ট্রাম্পের বিরোধ নতুন নয়। দীর্ঘদিন ধরেই সরকারের গোপন তথ্য সাংবাদিকদের কাছে প্রকাশের ঘটনায় তিনি ক্ষোভ জানিয়ে আসছেন। এর আগেও এ ধরনের কর্মকাণ্ডে জড়িত সরকারি কর্মকর্তাদের কঠোর শাস্তির দাবি তুলেছেন তিনি।
প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা সংস্থার ওই প্রতিবেদনের কিছু অংশ প্রকাশিত হওয়ার পর ট্রাম্প এর জন্য ডেমোক্র্যাটিক পার্টির আইনপ্রণেতাদের দায়ী করেছিলেন। সে সময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে তিনি লেখেন, ‘ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলোতে চালানো নিখুঁত অভিযানের তথ্য ডেমোক্র্যাটরাই ফাঁস করেছে। তাদের বিচার হওয়া উচিত!’
তথ্য ফাঁসের উৎস শনাক্ত করতে ট্রাম্প প্রশাসনও বিভিন্ন কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছে। হোয়াইট হাউসের কর্মী ও সামরিক কর্মকর্তাদের পলিগ্রাফ বা মিথ্যা শনাক্তকরণ পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি নিউইয়র্ক টাইমস, ওয়াশিংটন পোস্ট ও ওয়াল স্ট্রিট জার্নালসহ একাধিক সংবাদমাধ্যমের সাংবাদিকদের কাছে আদালতের সমন পাঠানো হয়েছে। প্রকাশ্যে আসা অভ্যন্তরীণ সরকারি তথ্যের উৎস খুঁজে বের করাই এসব পদক্ষেপের উদ্দেশ্য।
গত বছর মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর পেন্টাগনে সাংবাদিকদের প্রবেশাধিকার দেওয়ার ক্ষেত্রেও নতুন শর্ত আরোপ করে। শর্ত অনুযায়ী, পেন্টাগনে প্রবেশের অনুমতি পেতে আগ্রহী সাংবাদিকদের এমন একটি চুক্তিতে স্বাক্ষর করতে হতো, যেখানে অননুমোদিত তথ্য প্রকাশ না করার অঙ্গীকার থাকত।
তবে পেন্টাগনে কর্মরত অধিকাংশ সাংবাদিক ওই শর্ত মেনে নিতে অস্বীকৃতি জানান। পরে একটি ফেডারেল আদালত সাংবাদিকদের ওপর আরোপ করা নতুন শর্তগুলোর বেশ কয়েকটি বাতিল করে দেয়।
সরকারি তথ্য ফাঁসের বিষয়ে ট্রাম্পের কঠোর অবস্থান তার প্রথম মেয়াদেও দেখা গেছে। ২০১৭ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত প্রেসিডেন্ট থাকার সময়ও তিনি তথ্য ফাঁসকারীদের বিরুদ্ধে একাধিকবার তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছিলেন।



