tanaka
প্রচ্ছদজাতীয়মহাষ্টমী আজ, মণ্ডপে মণ্ডপে কুমারী পূজার আয়োজন

মহাষ্টমী আজ, মণ্ডপে মণ্ডপে কুমারী পূজার আয়োজন

ঢাকের বাদ্য, শঙ্খধ্বনি আর উলুধ্বনিতে মুখরিত দুর্গামণ্ডপ। বোধন, অধিবাস ও আমন্ত্রণের মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া শারদীয় দুর্গোৎসবে আজ মহাষ্টমী। দেবীর চরণে পুষ্পাঞ্জলি, বিশেষ পূজা ও সন্ধিপূজার পাশাপাশি দিনটির অন্যতম আকর্ষণ কুমারী পূজা। দেবী দুর্গার মাতৃরূপের আরাধনায় আজ ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য ও উৎসবের আমেজে মেতে উঠবেন সনাতন ধর্মাবলম্বীরা।

পঞ্জিকা অনুযায়ী, আজ সকাল ৭টা ৩৪ মিনিটের মধ্যে মহাষ্টমী তিথিতে মহাষ্টমাদ্যি কল্পারম্ভ ও মহাষ্টমী বিহিত পূজা অনুষ্ঠিত হবে। এরপর সকাল ৭টা ৫৫ মিনিট থেকে ৮টা ৪৩ মিনিটের মধ্যে সম্পন্ন হবে সন্ধিপূজা। সন্ধিপূজার পরই বিভিন্ন মণ্ডপে আয়োজন করা হবে কুমারী পূজার।

এদিন নতুন পোশাকে সজ্জিত হয়ে নারী-পুরুষ, শিশু-কিশোরসহ বিভিন্ন বয়সী ভক্তরা দেবীর চরণে পুষ্পাঞ্জলি দেবেন। রাজধানীর ঢাকার রামকৃষ্ণ মিশনসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে কুমারী পূজাকে ঘিরে নেওয়া হয়েছে বিশেষ আয়োজন।

রামকৃষ্ণ মিশন সূত্রে জানা গেছে, এ বছর সেখানে সকাল সাড়ে ৯টায় কুমারী পূজা শুরু হবে। এর আগে অনুষ্ঠিত হবে মহাষ্টমীর পূজা ও পুষ্পাঞ্জলি।

কুমারী পূজার ধর্মীয় তাৎপর্য

সনাতন ধর্মের শাস্ত্রীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, কুমারী কন্যার মধ্যে দেবী দুর্গার জীবন্ত মাতৃরূপ কল্পনা করে পূজা করা হয়। এই আরাধনার মধ্য দিয়ে ঈশ্বরের উপাসনার পাশাপাশি নারী ও মানবতার প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর বার্তাও তুলে ধরা হয়।

ভক্তদের মতে, কুমারী পূজার মূল শিক্ষা হলো নারীকে সম্মান করা, মানুষের মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করা এবং সৃষ্টির মধ্যে মাতৃশক্তির উপস্থিতি উপলব্ধি করা। শ্রী রামকৃষ্ণের ভাবধারায়ও কুমারীর মধ্যে ভগবতীর রূপ উপলব্ধি এবং মাতৃভাবের আরাধনাকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

শাস্ত্রীয় বিধান অনুসারে, সাধারণত এক থেকে ১৬ বছর বয়সী অবিবাহিত কন্যাকে কুমারী হিসেবে পূজা করা হয়। বয়সভেদে কুমারীদের বিভিন্ন নামে অভিহিত করার রীতি রয়েছে। যেমন—এক বছরের কন্যা ‘সন্ধ্যা’, দুই বছরের ‘সরস্বতী’, তিন বছরের ‘ত্রিধামূর্তি’, চার বছরের ‘কালিকা’, পাঁচ বছরের ‘সুভগা’ এবং ছয় বছরের কন্যা ‘উমা’ নামে পূজিত হন।

এ ছাড়া সাত বছরের কন্যার নাম ‘মালিনী’, আট বছরের ‘কুব্জিকা’, নয় বছরের ‘কালসন্দর্ভা’, দশ বছরের ‘অপরাজিতা’, ১১ বছরের ‘রুদ্রাণী’, ১২ বছরের ‘ভৈরবী’, ১৩ বছরের ‘মহালক্ষ্মী’, ১৪ বছরের ‘পীঠনায়িকা’, ১৫ বছরের ‘ক্ষেত্রজ্ঞা’ এবং ১৬ বছরের কন্যা ‘অন্নদা’ বা ‘অম্বিকা’ নামে পূজিত হন।

সেই ধারাবাহিকতায় ছয় বছর বয়সী কন্যাশিশুর মধ্যে দেবী উমার প্রতিরূপ কল্পনা করে আজ কুমারী পূজা অনুষ্ঠিত হবে।

চণ্ডীতে দেবীর সর্বব্যাপী মাতৃরূপের বন্দনায় বলা হয়েছে, ‘যা দেবী সর্বভূতেষু মাতৃরূপেণ সংস্থিতা’। অর্থাৎ, যিনি সকল জীবের মধ্যে মাতৃরূপে বিরাজমান, সেই দেবীকে বারবার প্রণাম।

কোলাসুর বধের কাহিনি ও কুমারী পূজার প্রচলন

ধর্মীয় কাহিনি অনুযায়ী, একসময় কোলাসুর নামের এক অসুর স্বর্গ ও মর্ত্য অধিকার করে নেয়। তার অত্যাচারে বিপন্ন দেবতারা মহাকালীর শরণাপন্ন হন। দেবতাদের প্রার্থনায় সাড়া দিয়ে দেবী মানবকন্যারূপে আবির্ভূত হন এবং কুমারীরূপে কোলাসুরকে বধ করেন। এরপর থেকেই মর্ত্যে কুমারী পূজার প্রচলন শুরু হয় বলে শাস্ত্রীয় বর্ণনায় উল্লেখ রয়েছে।

প্রতি বছর দুর্গাপূজার মহাষ্টমী তিথিতে কুমারী পূজার আয়োজন করা হয়। দেবীর জীবন্ত প্রতিরূপ হিসেবে কুমারী কন্যার আরাধনা এদিনের ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতায় বিশেষ মাত্রা যোগ করে।

নবমীতে মহাপ্রসাদ, দশমীতে বিসর্জন

এদিকে আগামীকাল মহানবমী তিথিতে সকাল ৯টা ৫৭ মিনিটের মধ্যে মহানবমী কল্পারম্ভ ও মহানবমী বিহিত পূজা অনুষ্ঠিত হবে। পূজা শেষে বিভিন্ন মণ্ডপে ভক্তদের মধ্যে মহাপ্রসাদ বিতরণ করা হবে।

এরপর ২১ অক্টোবর বিজয়া দশমীতে দর্পণ বিসর্জনের মধ্য দিয়ে দেবী দুর্গাকে বিদায় জানানো হবে। শাস্ত্রীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, এবার নৌকায় চড়ে কৈলাসে ফিরবেন দেবী।

প্রচলিত বিশ্বাসে, দেবীর ঘোড়ায় আগমনকে রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিরতা কিংবা ছত্রভঙ্গের ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হয়। অন্যদিকে, নৌকায় গমনকে শস্যবৃদ্ধি ও ভালো ফলনের প্রতীক মনে করা হয়। তবে এর সঙ্গে অতিবৃষ্টি বা বন্যার আশঙ্কার কথাও প্রচলিত রয়েছে।

মহাষ্টমীর পূজা, সন্ধিপূজা ও কুমারী পূজার মধ্য দিয়ে আজ দুর্গোৎসবের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিন উদ্‌যাপন করবেন সনাতন ধর্মাবলম্বীরা। দেবীর আরাধনার পাশাপাশি শান্তি, সম্প্রীতি, মানবিকতা ও কল্যাণের প্রত্যাশায় মুখর হয়ে উঠবে দেশের পূজামণ্ডপগুলো।