চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে তুরস্কে তৈরি পোশাক রপ্তানি থেকে আয় ১৪ কোটি ৬৬ লাখ ডলার ছাড়িয়েছে। রপ্তানি প্রবৃদ্ধির এই ধারা অব্যাহত থাকলে অর্থবছর শেষে দেশটিতে বাংলাদেশের মোট পণ্য রপ্তানি ১০০ কোটি ডলারে উন্নীত হওয়ার সম্ভাবনা দেখছেন রপ্তানিকারকেরা।
তুরস্কের বাজারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের চাহিদা বাড়ছে। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে দেশটিতে তৈরি পোশাক রপ্তানি থেকে আয় আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ১২৩ শতাংশের বেশি বেড়েছে। একই সময়ে তুরস্কে বাংলাদেশের সামগ্রিক পণ্য রপ্তানিও দ্বিগুণ হয়েছে। রপ্তানিকারকেরা মনে করছেন, নতুন এই সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে পারলে দেশটিতে বাংলাদেশের রপ্তানি আরও বাড়ানো সম্ভব।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) দেশভিত্তিক রপ্তানি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তুরস্কে ১৪ কোটি ৬৬ লাখ ৩০ হাজার ডলারের তৈরি পোশাক রপ্তানি করেছে বাংলাদেশ। গত অর্থবছরের একই সময়ে এ আয় ছিল ৬ কোটি ৫৭ লাখ ১০ হাজার ডলার। সেই হিসাবে এক বছরের ব্যবধানে তৈরি পোশাক রপ্তানি আয় বেড়েছে ১২৩ দশমিক ১৪ শতাংশ।
শুধু তৈরি পোশাক নয়, তুরস্কে বাংলাদেশের সব ধরনের পণ্য রপ্তানিতেও উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি হয়েছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে দেশটিতে মোট ২১ কোটি ৫ লাখ ৪০ হাজার ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়েছে। গত অর্থবছরের একই সময়ে রপ্তানি আয়ের পরিমাণ ছিল ১০ কোটি ৫২ লাখ ১০ হাজার ডলার। অর্থাৎ, সামগ্রিক পণ্য রপ্তানি বেড়েছে ১০০ দশমিক ১১ শতাংশ।
তুরস্কে বাংলাদেশের রপ্তানি প্রবৃদ্ধির এই হার জাতীয় রপ্তানি প্রবৃদ্ধির তুলনায় অনেক বেশি। ইপিবির হিসাবে, চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে বাংলাদেশের সামগ্রিক পণ্য রপ্তানি আয় বেড়েছে ৬ দশমিক ৩৪ শতাংশ। জুলাই-সেপ্টেম্বর সময়ে মোট রপ্তানি আয় হয়েছে ১ হাজার ৩০৯ কোটি ডলার। আগের অর্থবছরের একই সময়ে এ আয় ছিল ১ হাজার ২৩১ কোটি ডলার।
তুরস্কে রপ্তানি বাড়ানোর নতুন সম্ভাবনা
রপ্তানিকারকদের মতে, তুরস্কের বাজারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের বাড়তি চাহিদা কাজে লাগানো গেলে রপ্তানি আয়ের পরিমাণ আরও বাড়ানো সম্ভব। এমনকি চলতি অর্থবছরেই দেশটিতে বাংলাদেশের মোট পণ্য রপ্তানি ১০০ কোটি ডলারে উন্নীত হতে পারে। তবে এ লক্ষ্য অর্জনের জন্য শুধু তৈরি পোশাকের ওপর নির্ভর না করে অন্যান্য পণ্যের রপ্তানিও বাড়াতে হবে।
তুরস্ক বাংলাদেশের জন্য নতুন কোনো বাজার নয়। দীর্ঘদিন ধরেই দেশটিতে তৈরি পোশাকসহ বিভিন্ন ধরনের পণ্য রপ্তানি করে আসছে বাংলাদেশ। একসময় শুল্কমুক্ত সুবিধার কারণে তুরস্ক বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের গুরুত্বপূর্ণ বাজারে পরিণত হয়েছিল। তবে দেশটির শুল্কনীতিতে পরিবর্তন আসার পর সেখানে বাংলাদেশের রপ্তানি বড় ধরনের ধাক্কা খায়।
ইপিবির তথ্য অনুযায়ী, ২০১৩-১৪ অর্থবছরে তুরস্কে পণ্য রপ্তানি করে বাংলাদেশ সর্বোচ্চ রপ্তানি আয় করেছিল। পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন কারণে রপ্তানিতে ওঠানামা দেখা গেলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশটিতে বাংলাদেশের পণ্য রপ্তানি আবার বাড়তে শুরু করেছে।
স্থানীয় উৎপাদনে ঘাটতি, বাড়ছে বিদেশি পোশাকের চাহিদা
তুরস্কের বাজারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের রপ্তানি বাড়ার সম্ভাবনা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে নিট পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএর নির্বাহী সভাপতি ফজলে শামীম এহসান বলেন, তুরস্কে মানুষের জীবনযাত্রার মান ও আয় বেড়ে যাওয়ায় দেশটির শ্রমিকেরা ধীরে ধীরে তৈরি পোশাকশিল্প থেকে সরে আসছেন। এতে স্থানীয় উৎপাদনে একধরনের ঘাটতি তৈরি হচ্ছে। সেই ঘাটতি পূরণে বিদেশি পোশাকের চাহিদা বাড়ছে।
তাঁর মতে, বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানির জন্য তুরস্ক এখন একটি সম্ভাবনাময় বাজার। দেশের উৎপাদন সক্ষমতা, পণ্যের মান, প্রতিযোগিতামূলক দাম এবং নির্ধারিত সময়ে পণ্য সরবরাহের সক্ষমতা কাজে লাগিয়ে এ বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান আরও শক্তিশালী করার সুযোগ রয়েছে।
তবে এ সম্ভাবনা কাজে লাগাতে প্রচলিত পোশাক রপ্তানির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না বলে মনে করেন ফজলে শামীম এহসান। তিনি বলেন, উচ্চমূল্যের পোশাক, কৃত্রিম তন্তু ও কারিগরি বস্ত্রের মতো পণ্যের উৎপাদন ও রপ্তানি বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে পণ্যের বৈচিত্র্য বৃদ্ধি এবং মূল্য সংযোজনের ওপরও গুরুত্ব দিতে হবে।
তৈরি পোশাকের পাশাপাশি পাট ও পাটজাত পণ্য, জুতা এবং অন্যান্য সম্ভাবনাময় পণ্যের বাজার সম্প্রসারণের সুযোগ রয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি। এ জন্য তুরস্কের সঙ্গে বাণিজ্যিক যোগাযোগ বাড়ানো এবং নতুন বাজার সৃষ্টির উদ্যোগ জোরদার করার ওপর গুরুত্ব দেন বিকেএমইএর এই নেতা।
ফজলে শামীম এহসানের প্রত্যাশা, নতুন করে তৈরি হওয়া বাজারের সম্ভাবনা যথাযথভাবে কাজে লাগানো গেলে চলতি অর্থবছরেই তুরস্কে বাংলাদেশের মোট পণ্য রপ্তানি ১০০ কোটি ডলারে উন্নীত করা সম্ভব। এ লক্ষ্য অর্জনে সরকার ও বেসরকারি খাতকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।
বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্পর্ক জোরদারে উদ্যোগ
তুরস্কে বাংলাদেশের রপ্তানি বাড়ানোর পাশাপাশি দুই দেশের বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্পর্ক আরও জোরদার করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সঙ্গে তুরস্কের রাষ্ট্রদূত রামিস সেনের এক বৈঠকে এ বিষয়ে আলোচনা হয়েছে।
বৈঠকে দুই দেশের বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বাড়ানোর পাশাপাশি বস্ত্র খাতে কৌশলগত অংশীদারত্ব জোরদারের বিষয়টি গুরুত্ব পায়। বাংলাদেশে কৃত্রিম তন্তু ও কারিগরি বস্ত্র খাতে যৌথ বিনিয়োগ, তুরস্ক থেকে কাঁচামাল ও আধুনিক বস্ত্রযন্ত্র আমদানি এবং দ্রুত পণ্য পরিবহনে টার্কিশ এয়ারলাইনস ও ইস্তাম্বুল বিমানবন্দরের সরবরাহব্যবস্থা ব্যবহারের সম্ভাবনা নিয়েও আলোচনা হয়।
গত জুনে তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদানের বাংলাদেশ সফরের সময় দুই দেশের বাণিজ্যের পরিমাণ ১৩০ কোটি ডলার থেকে বাড়িয়ে ২০০ কোটি ডলারে উন্নীত করার আগ্রহের বিষয়টি আলোচনায় আসে। বাণিজ্য সম্প্রসারণের জন্য আরও অনুকূল কাঠামো গড়ে তোলার বিষয়েও তখন আলোচনা হয়।
ইপিবির ভাইস চেয়ারম্যান মোহাম্মদ হাসান আরিফও তুরস্কে বাংলাদেশের রপ্তানি বৃদ্ধির প্রবণতাকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, তৈরি পোশাকের বাড়তি চাহিদা, পণ্যের বৈচিত্র্য বৃদ্ধি, নতুন খাতে বিনিয়োগ এবং দুই দেশের বাণিজ্যিক সহযোগিতা জোরদার করা গেলে তুরস্কের বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানি সম্প্রসারণের সুযোগ আরও বাড়বে। তবে সেই সম্ভাবনাকে বাস্তব রূপ দিতে উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি, উচ্চমূল্যের পণ্যে বিনিয়োগ এবং প্রতিযোগিতামূলক বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান শক্তিশালী করার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।



