tanaka
প্রচ্ছদজাতীয়তিন সংগ্রামীর জীবনযুদ্ধের গল্প শুনলেন প্রধানমন্ত্রী, দিলেন সহযোগিতার আশ্বাস

তিন সংগ্রামীর জীবনযুদ্ধের গল্প শুনলেন প্রধানমন্ত্রী, দিলেন সহযোগিতার আশ্বাস

নিজ নিজ কর্ম, ত্যাগ ও ব্যতিক্রমী উদ্যোগের মাধ্যমে সমাজে অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন তিন সংগ্রামী মানুষ। তাঁদের একজন প্রকৌশলী হয়েও বেছে নিয়েছেন শিশুদের শিক্ষাদানের পথ, আরেকজন জন্ম থেকেই দুই হাত না থাকলেও পা দিয়ে লিখে গড়ে তুলেছেন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। অন্যজন নিজের সম্পদ ব্যয় করে প্রায় তিন দশক ধরে রোপণ করেছেন হাজার হাজার গাছ। তাঁদের জীবনসংগ্রাম ও জনকল্যাণমূলক কাজের গল্প শুনেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

গতকাল সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে এই তিন অনুপ্রেরণাদায়ী ব্যক্তির সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন প্রধানমন্ত্রী। তাঁরা হলেন—বুয়েট থেকে পাস করে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা বেছে নেওয়া নায়লা শারাফ, দুই হাত না থাকলেও বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা নরসিংদীর মো. আলতাফ হোসেন এবং ভোলার চরফ্যাশনে নিজ উদ্যোগে হাজার হাজার গাছ লাগানো রেজাউল কিবরিয়া বাবুল।

প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাতের সুযোগ পেয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন তাঁরা। এ সময় প্রধানমন্ত্রী তাঁদের জীবনসংগ্রাম, ব্যতিক্রমী উদ্যোগ ও সমাজের কল্যাণে পরিচালিত কার্যক্রমের কথা মনোযোগ দিয়ে শোনেন। তাঁদের কাজের প্রশংসা করার পাশাপাশি প্রয়োজনীয় সহযোগিতার আশ্বাস দেন তিনি।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘দেশ গঠনে আপনাদের মতো মানুষের অনেক প্রয়োজন।’

প্রকৌশলী হয়েও শিশুদের গড়ার স্বপ্ন নায়লার

মেধা, যোগ্যতা ও পেশাগত জীবনে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার একাধিক সুযোগ থাকলেও নায়লা শারাফ বেছে নিয়েছেন শিশুদের শিক্ষিত করে গড়ে তোলার পথ। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) থেকে পড়াশোনা শেষ করে তিনি স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরে (এলজিইডি) সহকারী প্রকৌশলী হিসেবে যোগ দেন। পরে কাজ করেন জনতা ব্যাংকেও।

৩৪তম বিসিএসের লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পরও মৌখিক পরীক্ষায় অংশ না নিয়ে শিশুদের শিক্ষাদানের কাজে নিজেকে নিয়োজিত করেন নায়লা। গত সাত বছর ধরে নেত্রকোণার পাঁচআননপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করছেন তিনি।

বিশেষ করে সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের পড়াশোনা সহজ, আনন্দময় ও কার্যকর করে তুলতে নিজ উদ্যোগে তৈরি করছেন বিভিন্ন শিক্ষা উপকরণ ও ডিজিটাল কনটেন্ট। প্রচলিত সাফল্যের সংজ্ঞায় যেখানে ভালো চাকরি ও পেশাগত প্রতিষ্ঠাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়, সেখানে শিশুদের আলোকিত মানুষ হিসেবে গড়ে তোলাকেই নিজের জীবনের লক্ষ্য হিসেবে গ্রহণ করেছেন নায়লা।

শিক্ষার প্রতি তাঁর নিষ্ঠা, ব্যতিক্রমী পেশা নির্বাচন এবং শিশুদের জন্য নিরলসভাবে কাজ করে যাওয়ার গল্প শুনে প্রশংসা করেন প্রধানমন্ত্রী। নায়লার উদ্যোগকে তিনি সমাজের জন্য অনুপ্রেরণাদায়ী দৃষ্টান্ত হিসেবে দেখেন।

দুই হাত নেই, তবু গড়েছেন শিক্ষার আলো ছড়ানোর প্রতিষ্ঠান

নরসিংদীর মো. আলতাফ হোসেনের জীবন প্রতিকূলতাকে জয় করে এগিয়ে যাওয়ার এক অসাধারণ উদাহরণ। জন্ম থেকেই তাঁর দুই হাত নেই। তবে শারীরিক সীমাবদ্ধতা তাঁর স্বপ্ন দেখার ক্ষমতাকে থামিয়ে দিতে পারেনি। পা দিয়ে লেখার দক্ষতা অর্জন করে সেই শক্তিতেই নিজের জীবন গড়েছেন তিনি। একই সঙ্গে অন্য শিশুদের শিক্ষার সুযোগ করে দিতে প্রতিষ্ঠা করেছেন একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান।

২০০৭ সালে নরসিংদীর পাঁচদোনায় প্রতিভা দুখু মিয়া কিন্ডারগার্টেন স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন আলতাফ। নিজের সঞ্চয় ও পৈতৃক জমি বিক্রি করে পাওয়া অর্থ দিয়ে গড়ে তোলেন বিদ্যালয়টি। বর্তমানে সেখানে ১৪৫ জন শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছে। তাদের পাঠদানের জন্য রয়েছেন ১০ জন শিক্ষক।

নিজের দৈনন্দিন কাজের পাশাপাশি পা দিয়েই লেখালেখি করেন আলতাফ। একইভাবে পরিচালনা করেন বিদ্যালয়ের বিভিন্ন কার্যক্রমও। প্রতিকূলতার কাছে হার না মেনে নিজের স্বপ্ন পূরণের পাশাপাশি এলাকার শিশুদের শিক্ষার সুযোগ তৈরি করেছেন তিনি।

তবে শিক্ষার্থীদের জন্য উন্নত পরিবেশ নিশ্চিত করতে বিদ্যালয়ের অবকাঠামোগত উন্নয়ন প্রয়োজন। আলতাফের জীবনসংগ্রাম ও শিক্ষার প্রসারে তাঁর অবদানের কথা শুনে প্রধানমন্ত্রী বিদ্যালয়টির জন্য নতুন ভবন নির্মাণ করে দেওয়ার আশ্বাস দেন।

নিজের সম্পদ ব্যয় করে তিন দশক ধরে বৃক্ষরোপণ

পরিবেশ সংরক্ষণ ও মানুষের কল্যাণে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করে যাচ্ছেন ভোলার চরফ্যাশনের রেজাউল কিবরিয়া বাবুল। মসজিদে ইমামতির দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি প্রায় তিন দশক ধরে নিজের অর্থ, শ্রম ও সময় ব্যয় করে বিভিন্ন সড়কের পাশে হাজার হাজার গাছ লাগিয়েছেন তিনি।

বৃক্ষরোপণের উদ্যোগকে আরও বিস্তৃত করতে পৈতৃক সম্পত্তি বিক্রি করে একটি নার্সারি গড়ে তোলেন বাবুল। সেখান থেকে উৎপাদিত চারা বিভিন্ন এলাকায় রোপণ করতে থাকেন। তাঁর লাগানো অনেক গাছ এখন বড় হয়েছে। সড়কপথে চলাচলকারী মানুষ এসব গাছের ছায়া পাচ্ছেন। পাশাপাশি গাছগুলো এলাকার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য বৃদ্ধি এবং পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় ভূমিকা রাখছে।

ব্যক্তিগত লাভের কথা না ভেবে দীর্ঘদিন ধরে পরিবেশের জন্য কাজ করে যাওয়া বাবুলের এই উদ্যোগও প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করে। তাঁর কাজের প্রশংসা করেন তারেক রহমান। একই সঙ্গে জনকল্যাণমূলক এ ধরনের উদ্যোগ অব্যাহত রাখতে তাঁকে উৎসাহ দেন প্রধানমন্ত্রী।

তিনজনের জীবন ও কর্মের গল্পে উঠে এসেছে মানুষের জন্য কাজ করার অদম্য ইচ্ছাশক্তি, প্রতিকূলতা জয় করার সাহস এবং সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতার অনন্য দৃষ্টান্ত। তাঁদের উদ্যোগ শুধু ব্যক্তিগত সাফল্যের গল্প নয়; বরং শিক্ষা, পরিবেশ সংরক্ষণ ও মানবকল্যাণে সম্মিলিতভাবে এগিয়ে যাওয়ার প্রেরণাও।